এক যুগ আগে, ২০১২ সালে, জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসেছিলেন পিরোজপুরের সুখরঞ্জন বালী। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ থেকে তাকে অপহরণ ও গুম করার অভিযোগ উঠেছিল। দীর্ঘ সময় পর, গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি ট্রাইব্যুনালে এসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে গুম, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় দাখিল করা এই অভিযোগে তিনি অপহরণ, ভারতে পাচার, পাঁচ বছর কারাবাসসহ তার ওপর চালানো নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
অভিযোগে শেখ হাসিনা ছাড়াও উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা, ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, সাবেক প্রসিকিউটর রানা দাসগুপ্ত, তৎকালীন তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক সানাউল হক, সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং পিরোজপুর-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়াল। এ ছাড়া পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কয়েকজন নেতাও অভিযুক্ত।
সুখরঞ্জন বালী তার অভিযোগে জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভাই বিশাবালীকে (বিশেশ্বর বালী) পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করেছিল। ২০১০ সালের জুলাই-আগস্টে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন তাকে পিরোজপুরের পাড়েরহাট রাজলক্ষ্মী স্কুলে ডেকে ভাইয়ের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। সুখরঞ্জন প্রকৃত ঘটনা বর্ণনা করলেও হেলাল উদ্দিন তাকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম হত্যাকারী হিসেবে উল্লেখ করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে চাপ দেন। তিনি স্পষ্ট জানান, সাঈদী এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দেবেন না। এরপর হেলাল উদ্দিন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের এমপি এ কে এম আউয়াল ও পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান মালেকের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা তার ওপর শারীরিক নির্যাতন করেন। সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানালে আউয়াল ও হাবিবুর রহমান তাকে হত্যার হুমকি দেন। এরপর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ভাইয়ের হত্যার প্রকৃত ঘটনা জানতে চান। সুখরঞ্জন তাকে সত্য ঘটনা জানান এবং সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে সম্মত হন।
সুখরঞ্জন বলেন, ‘২০১২ সালের ৩ নভেম্বর বিকেলে আমি ঢাকায় আসি এবং মাসুদ সাঈদীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। ৪ নভেম্বর তিনি আমাকে ট্রাইব্যুনালে অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলামের কাছে নিয়ে যান। আমি তাকে সব খুলে বলি।’
অপহরণ ও গুমের ঘটনা বর্ণনা করে সুখরঞ্জন বলেন, ‘২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সকালে মাসুদ সাঈদী আমাকে মিজানুল ইসলামের অফিসে নিয়ে যান। মিজানুল ইসলাম আমাকে তার গাড়িতে করে ট্রাইব্যুনালের দিকে নিয়ে যান। সামনে মাসুদ সাঈদীর গাড়ি ছিল। ট্রাইব্যুনালের গেটে পৌঁছালে পুলিশ আমাদের গাড়ি আটকে দেয়।’
তিনি জানান, মাসুদ সাঈদী পুলিশের সঙ্গে কথা বলার সময় সাদা পোশাকের লোকজন ও পুলিশ মিজানুল ইসলামের গাড়ি ঘিরে ফেলে। তারা তাকে গালাগাল করে, শার্টের কলার ধরে মারধর করে এবং জোর করে একটি সাদা পুলিশ পিকআপে তুলে নেয়।
তিনি আরও বলেন, ‘গাড়িতে তুলে আমার চোখ ও হাত বেঁধে অজানা একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেটি ছিল জানালাবিহীন অন্ধকার ঘর, যেখানে দুই মাস আমাকে আটকে রেখে খাদ্য ও আলো থেকে বঞ্চিত করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।’
তিনি জানান, পরে তাকে ক্যামেরাযুক্ত আরেকটি কক্ষে নিয়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়। তিনি সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করলে তার শরীরে বৈদ্যুতিক শকসহ নির্যাতন করা হয়। এমনকি কোটি টাকা ও বাড়ির প্রলোভন দেখিয়েও তাকে ভাঙানোর চেষ্টা করা হয়। তবু তিনি রাজি না হওয়ায় দুই মাস গোপন কক্ষে নির্যাতন করা হয়।
সুখরঞ্জন বলেন, ‘একদিন চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে গাড়িতে তুলে কয়েক ঘণ্টার যাত্রার পর সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিজিবির সহায়তায় আমাকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর থানার বৈকারী বাজার সীমান্তে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়।’
বিএসএফ তাকে বশিরহাটে নিয়ে নির্যাতন করে এবং ২২ দিন বশিরহাট সাবজেলে রাখার পর দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়, যেখানে তিনি পাঁচ বছর আটক ছিলেন। তিনি বলেন, ‘মাসুদ সাঈদী আমার কারাবাসের খবর জানতে পেরে আমার ছেলেকে ভারত পাঠিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তার উদ্যোগে মানবাধিকার সংস্থা ও ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সহায়তায় আমি মুক্তি পাই।’
দেশে ফিরে নিরাপত্তার কারণে তিনি পিরোজপুরে নিজ গ্রামে যেতে পারেননি এবং জেলার বাইরে আত্মগোপনে ছিলেন।
সুখরঞ্জন আরও জানান, ট্রাইব্যুনালে তার অপহরণের বিষয়ে তার আইনজীবীরা তাৎক্ষণিক অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক, চিফ প্রসিকিউটর, শাহবাগ থানার ওসি ও রমনা জোনের ডিসি ষড়যন্ত্র করে তার অপহরণের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে সিসি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিম ফুটেজ দেখতে বা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান এবং আমার আইনজীবীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন।’
তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘আমি নিজ চোখে আমার ভাইয়ের হত্যার ঘটনা দেখেছি, সাঈদী সেখানে ছিলেন না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। আমি সত্য সাক্ষ্য দিতে এসেছিলাম বলে আমাকে গুম, অপহরণ, নির্যাতন ও ভারতে পাঁচ বছর কারাবাসে রাখা হয়। সাঈদীকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার, কারারুদ্ধ ও পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ।’
তিনি এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
অভিযোগের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘সাঈদী সাহেবকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। আমি তার পক্ষে সত্য সাক্ষ্য দিতে এসেছিলাম। দিনরাত আলো না দেখে, নির্যাতন সহ্য করে আমি এখন বিচার চাইতে এসেছি।’
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘সুখরঞ্জন বালীকে ট্রাইব্যুনাল থেকে অপহরণ করে গোপন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয় এবং পরে বিজিবির মাধ্যমে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তার অভিযোগ তদন্ত সংস্থার কাছে পাঠানো হবে। তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে।’