বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশের প্রতিটি সেক্টরে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সংস্থা ওই সময়ের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করছে। নতুন করে সামনে এসেছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিস্টেম বাস্তবায়ন প্রকল্পের ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা। স্যাটেলাইটের জন্য ৮৮-৯১ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশের বদলে ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের অরবিটাল সøট ক্রয়ের কারণে এ পরিমাণ অর্থ লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগটির অনুসন্ধান শুরু করেছে। অনুসন্ধানের নেতৃত্বে রয়েছেন সংস্থাটির উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামানের দল।
চলতি বছর ১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিস্টেম বাস্তবায়ন প্রকল্পের ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। সংস্থাটির উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জিন্নাতুল ইসলাম ও উপসহকারী পরিচালক নাহিদ ইমরান।
জানা গেছে, দুদকের অনুসন্ধান টিম অভিযোগ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র চেয়ে চলতি বছর ১৭ মার্চ বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, স্যাটেলাইট প্রকল্পের পিডি (প্রজেক্ট ডিরেক্টর) মেজবাহ উদ্দিন ও অন্যরা রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে অবাস্তব ও অতি মূল্যায়িত ফিজিবিলিটি স্ট্যান্ড গ্রহণসহ বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য ৬ মিলিয়ন ডলার দামের ৮৮-৯১ দ্রাঘিমাংশের অরবিটাল সøট না কিনে রাশিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টার স্পুৎনিক থেকে চার-পাঁচগুণ বেশি দামে (২৮ মিলিয়ন ডলার) ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের অরবিটাল সøট কিনে রাষ্ট্রের ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ক্ষতি করেছেন। এ অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে নিম্নলিখিত রেকর্ডপত্র দুদকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হলো।
চিঠিতে যেসব রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিস্টেম বাস্তবায়ন প্রকল্পের ডিপিপি ও আরডিপিপির সত্যায়িত ফটোকপি; প্রকল্পের পিডি ও ডিপিডিসহ জনবল এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের ফটোকপি; পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা ফিজিবিলিটি স্টাডির প্রতিবেদনের কপি; দরপত্র আহ্বান থেকে বিল প্রদান পর্যন্ত সব ডকুমেন্টের ফটোকপি; অরবিটাল প্লটের জন্য আইটিইউতে পাঠানো আবেদনের সত্যায়িত ফটোকপি এবং আইটিইউর পাঠানো জবাবের ফটোকপি; রাশিয়া থেকে অরবিটাল সøøট কেনার বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদনের ফটোকপি; অরবিটাল সøট কেনার নথি ও পেমেন্ট ডকুমেন্টের ফটোকপি; গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণসংক্রান্ত নথির ফটোকপি; প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের উৎসের রেকর্ডপত্র এবং টেন্ডার ডকুমেন্টসসহ প্রস্তাব ও অনুষঙ্গিক কাজের নথির ফটোকপি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুদক আমাদের কাছে যেসব তথ্য চেয়েছে আমরা সেগুলো দিয়েছি। স্যাটেলাইট প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। কিন্তু ৬ মিলিয়ন ডলারের সøটের বদলে ২৮ মিলিয়ন ডলারের সøট কেনার তথ্য সঠিক নয়। আমাদের স্যাটেলাইটটি ফিলিপাইনের ওপর অবস্থান করছে। এতে ঢাকায় নেটওয়ার্ক পেতে সমস্যা হয়।’
দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘বিটিআরসি থেকে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কিছু রেকর্ডপত্র দুদকে এসে পৌঁছেছে। রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
অভিযোগে বলা হয়েছে, রাশিয়াভিত্তিক ইন্টার স্পুৎনিকের কাছ থেকে ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল সøট নেওয়ার সময়ই প্রশ্ন উঠেছিল এটি বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত কি না। বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এফ আর সরকার (প্রয়াত) তখন বলেছিলেন, ১১৯.১ ডিগ্রির অরবিটাল সøটটি বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে (প্রায় ৩০ ডিগ্রি পুবে)। অরবিটাল সøটটি বা নিরক্ষ রেখাটি অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু হয়ে ইন্দোনেশিয়া দিয়ে ফিলিপাইনের পশ্চিমাংশ এবং ভিয়েতনামের পূর্বদিক দিয়ে চীন ও মঙ্গোলিয়া হয়ে রাশিয়ার ওপর দিয়ে চলে গেছে। এতদূর থেকে স্যাটেলাইটে বাংলাদেশের ফুটপ্রিন্ট (ছবি) পাওয়ায় সমস্যা হবে। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ছিল নিজস্ব ৮৮-৯১ ডিগ্রির অরবিটাল সøট। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্পের অবাস্তব ও অতিমূল্যায়িত ফিজিবিলিটি স্টাডির কারণে কোটি কোটি টাকা মাশুল দিতে হচ্ছে দেশকে। ১৫ বছর মেয়াদের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার এ স্যাটেলাইট এখনো লাভের মুখ দেখেনি। লোকসানের আশঙ্কাই বেশি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসপিআইয়ের ‘আন্তর্জাতিক’ সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির কাজ ছিল, স্যাটেলাইট উৎক্ষপণের জন্য বাজার পর্যবেক্ষণ, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আইটিইউর সঙ্গে তরঙ্গ সমন্বয়, স্যাটেলাইট সার্ভিস ডিজাইন, স্যাটেলাইট আর্কিটেকচারাল ডিজাইন, সিস্টেম ডিজাইন, দরপত্র প্রস্তুত, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সুষ্ঠুভাবে উৎক্ষপণ পর্যবেক্ষণ। কিন্তু তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সময় অনেক কিছু হস্তান্তর করেনি। গ্রাউন্ড স্টেশনের কাছে ২০০ ফুট রাস্তাসহ আরও অনেক সুবিধা ডিপিপি অনুসারে কোম্পানিকে দেওয়া হয়নি।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মূল গ্রাহক হিসেবে বিবেচনায় রাখা হয় দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে। কিন্তু ১১৯.১ ডিগ্রির অরবিটাল সøটের কারণে তাদের প্রযুক্তিগত কী ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রকল্প থেকে সে পরামর্শ দেওয়া হয়নি। ফলে টিভি চ্যালেনগুলোকে স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়া হয়। এতে স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় আট মাস বিলম্বিত হয়। টিভি চ্যালেনগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি টিভির দর্শক অনেক। কিন্তু ১১৯.১ ডিগ্রির অরবিটাল সøটের মাধ্যমে সেখানে বাংলাদেশি টিভির সম্প্রচারের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান না হলে বিএসসিএলের সেবা নিতে টিভি চ্যানেলগুলো রাজি হতো না।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে পরিকল্পনা কমিশনের কিছু আপত্তি সত্ত্বেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকার এ প্রকল্প অনুমোদন করেন, যার ব্যয় পরে কমে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে যখন চুত্তি সই হয়, তখন ১৫৫ মিলিয়ন ইউরোর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত বিএসসিএল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে এ খাতে বিনিয়োগের এক পয়সাও ফেরত দিতে পারেনি।
২০১২ সালের ২৯ মার্চ বিটিআরসি চুক্তিবদ্ধ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনালের (এসপিআই) মাধ্যমে জানিয়েছিল, স্যাটেলাইট উৎক্ষপণ করার পর বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার (৬০০ কোটি টাকা) আয় করতে পারবে। কিন্তু এখন বছরে মোট আয় হচ্ছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। সার্বিকভাবে লাভের ঘরে কিছুই থাকে না।
২০১৮ সালের মে মাসে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেটের মাধ্যমে উৎক্ষপণ করা স্যাটেলাইটের জন্য প্রতি ছয় মাসে এইচএসবিসিকে প্রায় ৮৫ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয় বিটিআরসিকে। ২০২৮ সালের এপ্রিলের মধ্যে প্রায় ৬৪ মিলিয়ন ডলারের আরও আটটি কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। গত কয়েক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বিটিআরসির ওপর ঋণ পরিশোধের বোঝা বেড়েছে। এখন বিটিআরসিকে প্রতি বছর দুই কিস্তিতে ১৯০ কোটি টাকা থেকে ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়।
উৎক্ষপণের ছয় বছর পরও সম্ভাব্য বিদেশি গ্রাহক দেশগুলোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর ফ্রিকোয়েন্সি সমন্বয় ও ল্যান্ডিং রাইটস পাওয়ার কাজটি সম্পন্ন হয়নি। ইন্টার স্পুৎনিকের অরবিটাল সøটের অবস্থান ওই দেশগুলোর বেশিরভাগে প্রযোজ্য নয়। ফলে এ স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের ১৩টির কোনো গ্রাহক নেই। স্যাটেলাইটটির আয়ুষ্কাল ১৫ বছর। অর্থাৎ ২০৩৩ সালের পর আবার নতুন স্যাটেলাইটের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। ফলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে হাজার কোটি টাকারও বেশি।
২০১৪ সালে বিটিআরসির ১৪৭তম সভায় স্যাটেলাইট ও অরবিটাল সøটের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। সভায় জানানো হয়, আইটিইউতে বাংলাদেশের নিজস্ব অরবিটাল পজিশন পাওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু অনেক দেশ তাতে আপত্তি তোলে।
স্যাটেলাইটটির পরিচালনাকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকল্পটি পাসের সময় যে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল, তা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এতে বাজারের চাহিদা, প্রতিযোগিতা এবং রাজস্ব সম্ভাবনাকে অতি মূল্যায়িত করা হয়। এতে দেশের লাভক্ষতির চেয়ে ব্যক্তিবিশেষের বা একটি চক্রের স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিস্টেম বাস্তবায়ন প্রকল্পের ২ হাজার ৭০০ কোটি লোপাটের ঘটনায় দুদকের অনুসন্ধান শুরু হলে চলতি বছর ২৭ এপ্রিল পিডি মো. মেসবাহ উদ্দিন অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন। তিনি বলেছেন, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি ওই সময়ে প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্প শুরু হয় ২০১৪ সালের ১ জুলাই। তিনি প্রকল্পের শেষ ভাগে ২০১৭ সালের ৮ মে যোগদান করেন এবং ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বর্ধিত সময়কালে তিনি দায়িত্বে থাকার সময় এস্টিমেটেড কস্ট ২ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকার পরিবর্তে ২ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকায় শেষ করে ৩৯১ কোটি টাকা সাশ্রয় করে প্রকল্পের কাজ শেষ করেন।