যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস, শিক্ষা বা কাজের জন্য ভিসাপ্রত্যাশীদের জন্য নতুন একটি কঠোর নীতি ঘোষণা করেছে দেশটির প্রশাসন। নতুন নীতি অনুসারে, ভিসা আবেদনকারীদের ‘আমেরিকাবিরোধী’ মনোভাব বা কার্যকলাপ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। এই প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, মন্তব্য, অন্যান্য কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হবে। মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা (ইউএসসিআইএস) গত মঙ্গলবার এই নীতি ঘোষণা করেছে, যা অভিবাসন অধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং সম্ভাব্য অভিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইউএসসিআইএস-এর হালনাগাদ নীতিমালায় বলা হয়েছে, অভিবাসন কর্মকর্তারা এখন থেকে আবেদনকারীদের ‘আমেরিকাবিরোধী কার্যকলাপ’, সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ, বা ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ কার্যক্রমের প্রমাণ খুঁজবেন। এই নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের জুন মাসে চালু করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাচাইয়ের নিয়মকে আরও বিস্তৃত করেছে। এখন ভিসা আবেদনকারীদের সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত মতামত, পোস্ট, শেয়ার করা বিষয়বস্তু, এমনকি লাইক বা রিটুইটও পরীক্ষা করা হবে। সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, সংস্কৃতি, বা মূল্যবোধের বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্যকে ‘আমেরিকাবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে।
ইউএসসিআইএস-এর মুখপাত্র ম্যাথু ট্র্যাজেসার বলেন, ‘যারা আমেরিকাকে ঘৃণার চোখে দেখে বা আমেরিকাবিরোধী মতাদর্শ প্রচার করে, তাদের এই দেশের সুবিধা দেওয়া উচিত নয়।’
তিনি জানান, এই ধরনের মনোভাব নির্মূল করতে অভিবাসন সংস্থা কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
অবশ্য নীতিমালায় ‘আমেরিকাবিরোধী’ মনোভাবের কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নীতিমালায় শুধু বলা হয়েছে, এর মধ্যে ইহুদিবিদ্বেষী সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ, বা ইহুদিবিদ্বেষী মতাদর্শ সমর্থনকারীরা অন্তর্ভুক্ত। এই অস্পষ্টতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে এক্স-এ একটি পোস্টে বলা হয়েছে, ‘ইরানে হামলার বিরোধিতা করা বা গাজায় যুদ্ধবিরতির পক্ষে থাকা কী আমেরিকাবিরোধী হিসেবে গণ্য হবে? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারির বিরুদ্ধে কৌতুক শেয়ার করলে কি তা আমেরিকাবিরোধী বলে বিবেচিত হবে?’ এই ধরনের প্রশ্ন বিশ্বজুড়ে অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের অভিবাসন বিষয়ক আইনজীবী লি গেলান্ট বলেন, ‘এই নীতি অভিবাসীদের সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশে ভয় পেতে বাধ্য করবে। এটি তাদের বাক স্বাধীনতার ওপর আঘাত।’ তিনি বলেন,‘ আমেরিকাবিরোধী কার্যকলাপের অস্পষ্ট সংজ্ঞা অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে অপব্যবহারের সুযোগ করে দেবে।’
অভিবাসন নীতির ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির ইতিহাস দীর্ঘ ও জটিল। দেশটি বিভিন্ন সময়ে অভিবাসন নীতি সংস্কার করেছে। তবে, ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে অভিবাসন নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর হয়েছে। ২০১৭ সালে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, এইচ-১বি ভিসার ওপর বিধিনিষেধ এবং অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার ও নির্বাসন বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই নীতি আরও কঠোর হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ছয় হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল করা হয়েছে। গত জুনে ঘোষণা দেওয়া হয়, শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনকারীদের আমেরিকার সংস্কৃতি, সরকার, বা মূলনীতির প্রতি বিরূপ মনোভাব আছে কি না, তা দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো যাচাই করবে। এ ছাড়া, পাবলিক চার্জ রুল পুনরায় কার্যকর করা হয়েছে, যার ফলে সরকারি সুবিধা গ্রহণকারী অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড বা নাগরিকত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। এই নীতি অভিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অভিবাসী অধিকারকর্মী অ্যারন রেইচলিন-মেলনিক বলেন, ‘অভিবাসন আইনে ‘আমেরিকাবিরোধী’ শব্দটির কোনো পূর্বনজির নেই। এর সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল।’ তিনি এই নীতিকে ১৯৫০-এর দশকের ‘ম্যাকার্থিজম’ যুগের সঙ্গে তুলনা করেন।
ব্রিগহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ইয়েনি লিলি লোপেজ বলেন, ‘এই নীতি গৎবাঁধা বিশ্বাস ও পক্ষপাতকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। আবেদনকারীদের এখন আমেরিকার মানদণ্ড পূরণের জন্য আরও বেশি প্রমাণ দিতে হবে।’
নীতিটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও শিক্ষা খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ৪০ বিলিয়ন ডলারের অবদান রেখেছে। নতুন নীতির ফলে শিক্ষার্থী ভিসা আবেদন হ্রাস পেলে এই অবদান কমে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিবাসন নীতি বিশ্বজুড়ে অভিবাসীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ‘আমেরিকাবিরোধী’ মনোভাবের অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অভিবাসন প্রক্রিয়াকে জটিল করবে।