গল্প শুনতে কে না ভালোবাসে? তবে সব শ্রোতা সব ধরনের গল্প পছন্দ করে না। তবে নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো নির্বিশেষে সবাই রূপকথার গল্প শুনতে ভালোবাসে। আর শিশুদের কথা তো বলাই বাহুল্য। অতি দুরন্ত শিশুটিও রূপকথার গল্পের কথা শুনলে চুপটি করে বসে। মনোযোগ দিয়ে গল্প শোনে। কৌতূহল আটকে রাখতে না পেরে ক্রমাগত প্রশ্ন করে, তারপর? তারপর কী হলো?
রূপকথার গল্পের এই আদর শুধু আমাদের দেশ বা এই উপমহাদেশে নয়। সারা পৃথিবীতেই। এই সহজ সরল ভাষা, নাটকীয় কাহিনি, গল্পের চমৎকার চড়াই-উতরাই, ন্যায়ের জয়-অন্যায়ের পরাজয়, পরিচিত পরিবেশ আর সুন্দর মিলনাত্মক পরিসমাপ্তি দিয়েছে রূপকথার গল্পকে এমন তুলনারহিত জনপ্রিয়তা। কিন্তু রূপকথা কি শুধু সুন্দর সময় কাটানোর একটি মাধ্যম? নাকি তার থেকে বেশি কিছু? না, রূপকথা শুধু বিনোদন নয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এসব রূপকথার গল্পের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় একটি নির্দিষ্ট দেশ, জাতি ও জনপদের মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। যুক্ত থাকে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চিন্তাচেতনা। রূপকথারা তাই সুপ্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষাদানের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সুচারুভাবে। আর এই শিক্ষা প্রত্যক্ষ শিক্ষা না হওয়ায় শিশুসহ সববয়সী মানুষের মন ও মনন গেঁথে যায় অবচেতনে গভীরভাবে। বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা উপাদানসমৃদ্ধ হওয়া তাই সব দেশের রূপকথা একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে বিস্তর ফারাক থাকলেও নীতিশিক্ষার ব্যাপারটিতে মোটা দাগে মিল থাকায় দেশগুলোর রূপকথার মধ্যে মিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ঠিক সে কারণেই কোরিয়ার রূপকথার সঙ্গে বাংলাদেশের রূপকথার মিল খুঁজে পাওয়া কোনো কাকতালীয় কোনো ব্যাপার নয়। কোরিয়ার রূপকথা বইটি পড়লেই এই কথার সত্যতা খুঁজে পাবে।
কোরিয়ার রূপকথা বইটিতে মোট নয়টি গল্প রয়েছে। সেগুলো হলো তিন বোন তিন জন, ডাইনির ছেলে শেয়াল, ছেলেটি ও বাঘ, কুকুর কেন বেড়ালকে তাড়া করে, আকাশ ও তারা, বুড়ো বাঘের কান্ড, কুনগান বাঘের কান্ড, একেই বলে ভাগ্য ও কার বয়স বেশি।
রূপকথার গল্পের মাধ্যমে প্রাকৃতিক বিভিন্ন ঘটনার কারণের একটি বিশ্বাসযোগ্য বা ছোটদের সন্তুষ্ট করার মতো একটি উত্তর প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতাও দেখা যায়। কোরিয়ার রূপকথা বইটির প্রথম গল্পের এমনই একটি গল্প। ছোট্ট শিশু ক্রমাগত প্রশ্ন করে, এটা কী, ওটা কী? এটা ওখানে কেন? ওটা ওখানে কেন? জীবনে একবারও প্রশ্ন করেনি, আকাশে এত তারা কীভাবে এলো এমন শিশু বিরল। এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে বাবা-মাকে প্রশ্ন করেনি, আকাশের রঙ এত পরিবর্তিত হয় কেন? তেমনি একটি প্রশ্ন হলো, দিনের বেলায় যে আলো দেয় কী তার পরিচয়? রাতের বেলা যে আলো দেয় সে কি আলাদা কেউ? কে সে? কখনো কখনো রাতের আকাশে ঝিকিমিকি করে জোনাকির মতো ওরাই বা কারা? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে প্রথম গল্পটা পড়ে। গল্পটি হায়সুনি, টায়সুনি আর পিওসুনি নামের তিন কোরীয় বোনের। তাদের সঙ্গে আকাশের এসব বাসিন্দাদের কী সম্পর্ক তা আমি বলব না। গল্পটি পড়লেই বুঝতে পারবে।
আরেকটা ব্যাপার নিশ্চয় খেয়াল করেছ, বিড়ালকে দেখলে কুকুর তাকে তাড়া করে? কারণটি কী বলতে পারবে? যদি না জানো তবে এই বইয়ের, কুকুর কেন বেড়ালকে তাড়া করে গল্পটি পড়লেই বুঝতে পারবে এক সময়ের প্রবল দুই বন্ধু কেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শত্রুতা লালন করে চলেছে। বাংলাদেশের লোককাহিনি পান্তাবুড়ির গল্প নিশ্চয়ই তোমরা জানো? ছেলেটি ও বাঘ গল্পটা পড়লে এর সঙ্গে পান্তাবুড়ি গল্পের দারুণ মিল পাবে। লেখার প্রথমে যে বলেছিলাম, বিভিন্ন দেশের রূপকথার মধ্যে অনেক মিল দেখা যায় তার প্রমাণ পাবে হাতে হাতে। বুড়ো বাঘের কান্ড গল্পটি নিখাদ হাসির গল্প। পড়ার পর তোমার যেমন হাসি পাবে তেমনি বেচারা বুড়ো বাঘের জন্য মায়াও হবে। তবে বাঘটা দুষ্টুও ছিল। ফলে তার তো শাস্তি প্রাপ্য, তাই না? একেই বলে ভাগ্য গল্পের শেষের দিকে দুষ্টু লোভী জমিদারের পরিণতির সঙ্গে মিল পাবে আলীবাবা ও চল্লিশজন চোর গল্পের চোরদের পরিণতির।
এসব মিল খুঁজে পেতে পেতে এগিয়ে যেতে তোমার মন্দ লাগবে না। মিল যেমন পাবে তেমন নতুন গল্প আর নতুন সংস্কৃতির কথাও জানতে পারবে তুমি বইটি থেকে। আর তাতেই বুঝবে, মানুষে মানুষে আমাদের কত মিল! বিভিন্ন দেশের মানুষের অন্তর্গত সাদৃশ্য দেখিয়ে দেয় রূপকথা। রূপকথা আমাদের বাঁধনে বেঁধে ফেলে না, বরং আমরা বহু আগে থেকে যে অদৃশ্য বাঁধনে বাঁধা সেটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বইটি তোমাদের ভালো লাগবে!
সুলতানা রাজিয়া