বাঙালির ঐতিহ্যের পাতায় পাতায় লেখা ছিল তাদের গল্প। তারা ছিল আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় তারা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে স্মৃতির অতল গহ্বরে। গ্রামবাংলার সেই সোনালি দিনগুলো মনে পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পালকি, বায়োস্কোপ, ঢেঁকি, শিকা, শীতলপাটি আর পালতোলা নৌকার মতো হাজারো জীবনময় ছবি। আসুন, ফিরে যাই সেই হারানো দিনের পথে, যেখানে এখনো বাতাসে ভেসে আসে পুরনো দিনের গল্প। লিখেছেন হুমায়ুন আহমেদ নাইম
পালকি
প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতির বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সংস্কৃতির অন্যতম একটি হলো পালকি। পালকি ছাড়া বিয়ে তখন ভাবাই যেত না। গ্রামের বাড়িতে নববধূ তুলে আনার জন্য সেসময় পালকি ব্যবহার করা হতো। পালকি বহনকারীরা সামাজিকভাবে সম্মানিত হতেন। যেই বাড়িতে নতুন বউ পালকি ছাড়া আসতেন সেই বাড়ির মর্যাদা যেন অনেকটাই কমে যেত। আর যেই বাড়িতে নতুন বউ পালকিতে আসতেন সেই বাড়ির মর্যাদা অনেকটাই বেড়ে যেত। সারা দেশে এক সময় এই পালকির ব্যাপক প্রচলন ছিল। ষাটের দশকের বিভিন্ন বাংলা চলচ্চিত্রে পালকির ব্যবহার দেখা যায়। বর্তমানে নাটক-সিনেমার নির্মাতারা যদি মনে করেন তাদের নাটক বা সিনেমায় পালকির ব্যবহার করবেন তাহলে সম্ভবত তারা আর পালকি খুঁজে পাবেন না। এর জন্য তাদের যেতে হবে জাদুঘরে। পালকির জায়গায় আজ প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস দখল করে নিয়েছে। বাংলার ঐতিহ্য থেকে পালকি আজ হারিয়ে গেছে।
শিকা
প্রাচীন গ্রামবাংলার বাড়িতে বাড়িতে একসময় শিকার প্রচলন ছিল। পাটের তৈরি দৃষ্টিনন্দন শিকা প্রতিটি গ্রামের বাড়িতে দেখতে পাওয়া যেত। নারী যখন শ্বশুরবাড়িতে যেত তখন সঙ্গে করে একটি সুন্দর শিকা নিয়ে যেত। ঝুলন্ত অবস্থায় এই শিকাতে অতি প্রয়োজনীয় জিনিস রাখা যেত। একে বর্তমানের মিটসেফ কিংবা আলমারির পূর্বসূরি বলা চলে। নিরাপত্তার কারণে এই শিকার প্রচলন ছিল। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলায় আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশ এই শিকা এখন আর দেখতে পাওয়া যায় না।
বায়োস্কোপ
তখনকার সময়ে সারা দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই বায়োস্কোপের ব্যাপক প্রচলন ও জনপ্রিয়তা ছিল। বাংলাসাহিত্যে আমরা বায়োস্কোপের কথা শুনতে পাই। যারা বায়োস্কোপ দেখাতেন ছোট-বড় সবার কাছে তাদের কদর ছিল। দেশের কোথাও কোথাও এখনো বায়োস্কোপ দেখতে পাওয়া গেলেও এর সংখ্যা খুবই কম।
ঢেঁকি
প্রাচীনকালে ধান ও চাল ভাঙানোর জন্য প্রতিটি অঞ্চলেই ঢেঁকির ব্যবহার ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে দেশে শিল্পায়ন দ্বারা একাধিক চাল ও ধান ভাঙানোর কল তৈরি হওয়ার কারণে ঢেঁকির প্রচলন কমে যায়। গ্রামবাংলার মা- বোনেরা বেশিরভাগ সময় পিঠার চাল কিংবা কোনো কিছু গুঁড়া করার জন্য ঢেঁকি ব্যবহার করতেন। বর্তমানে কোনো কোনো বাড়িতে শৌখিন বস্তু হিসেবে ঢেঁকিকে রেখে দেওয়া হয়েছে।
শীতলপাটি
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে শীতলপাটির এক নিবিড় সম্পর্ক আছে। প্রাচীনকালে মেহমানকে বসানোর জন্য এখনকার মতো আধুনিক উপকরণ ছিল না, ছিল শুধু শীতলপাটি। এই শীতলপাটিতেই অতিথিরা বিশ্রাম নিতেন, কখনো নিদ্রা যেতেন, কখনো বা বিশেষ অতিথির সম্মানে উপস্থাপন করা হতো বিশেষ এই পাটি। কিন্তু আজ শীতলপাটি আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। কিছু শীতলপাটি বিদেশে রপ্তানির জন্য তৈরি করা হলেও পরিমাণে তা অপ্রতুল।
পালতোলা নৌকা
একসময় রঙবেরঙের পাল খাটিয়ে পণ্যের পসরা সাজিয়ে ভাটিয়ালি গানের সুরের তালে তালে ভেসে বেড়াত পালতোলা নৌকা। আর এখন তা সহসা দেখা যায় না। কিন্তু সে সময় পালতোলা নৌকাই ছিল যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। যাতায়াতের পাশাপাশি এসব পালতোলা নৌকায় করে জেলেরা নদীতে মাছ শিকার করত। নদী কিংবা হাওরে যখন নৌকাগুলো একসঙ্গে চলত, মনে হতো যেন এক সৌন্দর্যের দৃষ্টিনন্দন স্বর্গরাজ্য এ বঙ্গভূমি।