বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সদ্য ঘোষিত জুলাই সনদের চূড়ান্ত খসড়া। এই সনদটি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে তৈরি হলেও, এতে বেশ কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে বিএনপি এবং তাদের জোটভুক্ত শরিকদের পক্ষ থেকে। বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদের তিনটি মূল অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রী ও দলীয়প্রধানের পদ পৃথকীকরণ, নি¤œকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্য নির্বাচন এবং সনদের প্রাধান্য সংবিধান ও আইনের ওপরে এই তিন প্রস্তাবে সাড়া দেবে না দলটি। এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তের পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানে রয়েছে বিএনপি।
জুলাই সনদে তিনটি মূল অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে : সনদের প্রাধান্য সংবিধান ও আইনের ওপরে থাকবে, সনদের বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না এবং নির্বাচনের পূর্বে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার বাস্তবায়ন করবে সরকার।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং এর ওপরে কোনো সমঝোতা দলিলকে স্থান দেওয়া অসাংবিধানিক ও বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। জুলাই সনদের খসড়ায় ৮৪টি প্রস্তাবে ঐকমত্য এবং ১৫টি বিষয়ে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি প্রস্তাবে বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে। এগুলো নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং সংবিধানসম্মত আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করে বিএনপি। এসব মৌলিক প্রস্তাবে বিএনপি ছাড় দিতে রাজি নয়Ñএমন ইঙ্গিত দিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ১৯ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে এক আলোচনা সভায় বলেন, ‘১৯৭১ আমাদের মূল কথা। স্বাধীনতার যুদ্ধ আমাদের মূল কথা, সেখানে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমাদের কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। আমরা অবশ্যই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং গণতন্ত্রই চাই।’
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংবিধানের ৭৯ ও ১২৫ অনুচ্ছেদ সংসদের কার্যক্রম ও নির্বাচনী বিষয় আদালতে চ্যালেঞ্জের বাইরে রাখলেও, সনদকে একইভাবে আদালতের আওতার বাইরে রাখার প্রস্তাব নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই সনদ রাজনৈতিক সমঝোতা। একে সুপ্রা-কনস্টিটিউশনাল করার প্রস্তাব করা হলে তা হবে কর্র্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ।’ সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, কমিশনের কাছে ৩৫ পৃষ্ঠার মতামত দিয়েছে বিএনপি। সংস্কার প্রস্তাব এবং অঙ্গীকারনামার বিষয়ে দলীয় মতামত জানিয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে আমরা একটি সংবিধান পেয়েছি। সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের ওপরে কোনো কিছুকে প্রাধান্য দেওয়া যায় না। জুলাই সনদ রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। সমঝোতার দলিল সংবিধানের ওপরে প্রাধান্য পেতে পারে না।’
বিএনপি চায়, যেসব সাংবিধানিক সংস্কারে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো নির্বাচনের আগে নয়, আগামী সংসদে বাস্তবায়ন করা হোক। যদিও বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদের ১০টি নোট অব ডিসেন্ট-এর মধ্যে কিছু বিষয়ে ছাড় দিয়ে আরও উদারতা দেখাতে পারে দলটি। এর মধ্যে ৭০ অনুচ্ছেদ, চারটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া, এবং প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ইস্যুতে ছাড় দিয়েছে তারা।
উচ্চকক্ষের পিআর পদ্ধতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন পদ্ধতি নিয়েও আলোচনার মধ্যে রেখে সংস্কারের সুযোগ থাকলে তা ভেবে দেখবে দলটি। বিএনপির শরিকরাও এমন মনোভাব পোষণ করছে।
জানতে চাইলে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি কাছাকাছি আসার। নিজেদের মধ্যে আরও বোঝাপড়া বাড়াতে চাই। সবাইকে ছাড় দিয়ে, ঐক্যবদ্ধ থেকে সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে দেশ ফিরতে পারে।’
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমান সংস্কার প্রশ্নে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থান বা প্রকাশ্যে নানা মেরূকরণ দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, আপত্তি বা মতপার্থক্য যাই থাকুক, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সংস্কারের বিষয়ে বর্তমানে সক্রিয় দলগুলোর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে এই মুহূর্তে যে আলোচনা চলছে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সংবেদনশীল ও পরীক্ষামূলক সময়। জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা, আইন ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অঙ্গীকার রক্ষার ওপর। এখন দেখার বিষয়, আলোচনার মাধ্যমে দলগুলো কতটা ছাড় দিতে পারে এবং দেশ কীভাবে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে অগ্রসর হয়।