জমিতে ধান কিংবা সবজি চাষের আগে কয়েক দফা সার ও রাসায়নিকের ব্যবহার একদিকে যেমন খরচ বাড়ায় তেমনি নষ্ট করছে মাটির গুণাগুণ। তবে প্রচলিত এসব ক্ষতিকারক রাসায়নিক বিপরীতে প্রাকৃতিক উপকরণে চাষাবাদের পদ্ধতি তৈরি করেছেন নেত্রকোনার একদল কৃষক। যার নাম দিয়েছেন ফসলের হাসপাতাল।
নেত্রকোনা-মদন সড়কের আটপাড়ার দূর্গাশ্রম অবস্থিত ফসলের এই হাসপাতাল। জরাজীর্ণ ছোট্ট একটি টিনের ঘর। যা পরিচালনাও করছেন দূর্গাশ্রম বাঘড়া হাওর কৃষক সমবায় সমিতির একদল কৃষক।
এই হাসপাতালে ধান থেকে শুরু করে সবজি সকল ফসলের চাষাবাদ পদ্ধতিতে পোকার আক্রমণ কিংবা সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেন কৃষকরা। বাজারের প্রচলিত ক্ষতিকারক রাসায়নিকের পরিবর্তে কৃষকদের প্রাকৃতিক উপকরণের মাধ্যমে জমির পোকা দমন ও চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এতে একদিকে যেমন চাষাবাদে অতিরিক্ত অর্থে ব্যয় কমে তেমনি মাত্রাতিরিক্ত সার কিংবা কীটনাশক ব্যবহার কমায় বাড়ে মাটির গুণগত মান।
ফসলের হাসপাতালে অন্যতম উদ্যোক্তা সায়েদ আহমেদ খান বাচ্চু জানান, মানুষ ও পশুর হাসপাতাল আছে কিন্তু ফসলের নেই। আমরা এই ফসলের হাসপাতাল তৈরি করেছি। কৃষকরা ধান থেকে শুরু করে সবজির নানা রোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। আমরা বাজারের সার বা কীটনাশকের পরিবর্তে নিম, মেহগনির বীজ, ছাই, সাবানের গুড়াসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়েই জমির পোকামাকড় দমনের পদ্ধতি শেখাই। যা ব্যবহার করে সহজেই ভালো ফলন এবং পোকা দমন করা যায়। এতে করে উপকারী পোকাও রক্ষা পায় এবং কৃষকদের অর্থের অপচয় হয় না।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল আলীম জানান, জমিতে যে বিষ এবং রাসায়নিকের ব্যবহার হয় তা সবজি বা ফসলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। এতে নানা রকম অসুখ-বিসুখের দেখা দেয় এবং অর্থের অপচয় হয়। আমরা প্রাকৃতিক উপকরণের মাধ্যমে ফসলের ক্ষতিকারক পোকা দমন করা এবং উপকারী পোকা রক্ষা করছি। কৃষকরা সহজেই তাদের হাতে থাকা উপকরণ দিয়ে প্রাকৃতিক জৈব বালাইনাশক তৈরি করতে পারছেন। প্রাকৃতিক উপকরণের মাধ্যমে ফসল চাষে যেমন অর্থের খরচ কম হয় তেমনি কৃষকরাও অধিক ফলন পান।
পরিবেশবিদ ও বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. অহিদুর রহমান বলেন, কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে মাটি পানি বায়ুর দূষণ হচ্ছে। এই দূষণের ফলে মানব স্বাস্থ্য ও পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি সাধন হচ্ছে। এই দূষণ রোধে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের গুরুত্ব অনেক। প্রাকৃতিক উপকরণের মাধ্যমে চাষাবাদ বিস্তারে ফসলের হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মাধ্যমে ক্ষতিকারক ও রাসায়নিক এর পরিবর্তে কৃষক নিজেরাই জৈব বালাইনাশকের মাধ্যমে চাষাবাদ করে আসছে।
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ি) উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, আমরা আইপিএম পদ্ধতির মাধ্যমে বিষমুক্ত ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। এছাড়াও প্রাকৃতিক উপকরণের মাধ্যমে চাষাবাদ পদ্ধতি বিস্তারে কৃষকদের নানা পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই অংশ হিসেবে আটপাড়া উপজেলার্ একদল কৃষক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়ে ফসলের হাসপাতাল তৈরি করে প্রাকৃতিক উপকরণের মাধ্যমে জৈব বালাইনাশক মাধ্যমে ফসল চাষে অন্যান্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে। এই উদ্যোগটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তাদের দেখে যদি আরও কৃষক এগিয়ে আসেন তাহলে কম খরচে বিষমুক্ত পরিবেশ বান্ধব ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।