পিটুনির আঘাতে মা বলেও ডাকতে পারছে না কিশোর মানিক

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা ও দুজনকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় ফুঁসছে এলাকাবাসী। এমন নির্মমতার প্রতিবাদে এলাকাবাসী বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে। 

বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) দিবাগত রাতে ‘চোর’ সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় কিশোর মো. রিহান মাহিনকে (১৫)। পিটিয়ে আহত করা হয় তার দুই বন্ধু রাহাত ও মানিককে।

কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিল তারা। বাড়ির কাছাকাছি এলেই চোর সন্দেহে সেতুতে বেঁধে পেটান স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় রিহান মাহিন।

গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে কিশোর রাহাত ও মানিককে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ড ও অর্থপেডিক ওয়ার্ডে। 

রবিবার (২৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, গুরুতর আহত কিশোর  মানিক বিছানায় শুয়ে আছে। 

চিকিৎসকরা জানান, তার ডান হাতের কয়েকটি হাড় ভেঙে গেছে। পায়ে ছোপ ছোপ ক্ষত। ডান হাতে প্লাস্টার। বিছানার পাশে বসে ছেলের চেহেরার দিকে চেয়ে চেয়ে শুধু কাঁদছেন মা রোজী আক্তার। 

"আমার ছেলেরে কেন তারা এভাবে মারল। চুরি করলে দেশে পুলিশ আছে। আইন আছে। বিচার আছে। ছেলেটা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। মুখ দিয়ে মা বলেও ডাকতেও পারছে না" কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন মা রোজী আক্তার। 

এই ঘটনায় আহত অপর কিশোর  রাহাতের চিকিৎসা চলছে চমেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে। মানিকের মতো তার শরীরেরও একাধিক জখমের চিহ্ন৷ তার হাত ভেঙে দিয়েছে পাষণ্ডরা। থেতলে দেয়া হয়েছে তার মাংসপেশি।

রাহাতের স্বজন মো. লোকমান বলেন, "কিশোর রিহান, রাহাত ও মানিককে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত টানা পাঁচঘণ্টা পেটানো হয়। মারা যাওয়ার পরেও সেতুর সঙ্গে বেঁধে পেটানো হয়েছে রিহানকে। এমন বর্বরতা ফটিকছড়িতে এর আগে কেউ দেখেনি। খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"

অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের নার্স রাজেয়া জানান, কিশোর রাহাতকে দুই ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে । ডাক্তাররা বলেছেন, তারজন্য আরও রক্ত লাগবে। জখম এতটাই গুরুতর যে, সে কিছুই খেতে পারছে না। শুক্রবার ভর্তি হলেও রাহাতের জ্ঞান ফিরেছে আজ রবিবার সকালে। চোখ খুললেও কথা বলতে পারছে না সে।

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল জানান, রাহাত, মানিক ও রিহান তারা তিন বন্ধু। ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর গ্রামের বাসিন্দা। বুধবার (২০ আগস্ট) তারা বেড়াতে  গিয়েছিল কক্সবাজারে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গ্রামে ফিরতেই হামলার শিকার হয় তারা। এসপি স্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ ঘটনায় নিহত মাহিনের পরিবারের পক্ষ থেকে  শুক্রবার (২২ আগস্ট) রাতে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এ মামলা করেন নিহত কিশোরের মা খদিজা বেগম। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যে মো. নোমান (২২) ও মো. আজাদ (২৩) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন নির্মমতায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না৷

পুলিশের ভাষ্য, পূর্ব শত্রুতার জেরে চুরির নাটক সাজিয়ে তিন কিশোরকে পেটানো হয়েছে। ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর আহমদ বলেন, ‘একই গ্রামের যুবকেরা হামলা করায় এটিকে গণপিটুনি বা চোর সন্দেহ মারধর মনে হচ্ছে না। তাদের মধ্যে হয়তো কোনো বিরোধ বা শত্রুতা থেকে এ ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে।' 

কিশোর মানিকের স্বজন আব্দুল মান্নান জানান, কক্সবাজার থেকে ফিরে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রিহানদের বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামে তিন কিশোর। এ সময় হঠাৎ চোর চোর বলে তাদের ধাওয়া করেন লাঠিসোঁটা হাতে থাকা সাত/ আটজন। তাদের পিটুনি থেকে বাঁচতে কিশোরেরা দৌড়ে আশ্রয় নেয় নির্মাণাধীন একটি দোতলা বাড়ির ছাদে। তাদের ধরে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে একটি সেতুর ওপর আনা হয়। পরে তিনজনকে সেতুর সঙ্গে বেঁধে পাঁচঘণ্টা ধরে পেটানো হয় ।