শয়তানের মুখে সত্য কথা

প্রত্যেক মানুষ জীবনে নিরাপত্তা চায়। ঘরবাড়ি ও শারীরিক সুরক্ষার জন্য নানারকম উদ্যোগ গ্রহণ করে। দরজায় তালা, জানালায় গ্রিল, এমনকি পাহারাদার পর্যন্ত নিযুক্ত করে। এসব দিয়ে চোর-ডাকাতের উপদ্রব থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া গেলেও শয়তান থেকে বাঁচা সহজ নয়। সে চাতুর্যের সঙ্গে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে ইমান লুটে নেয়। আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দেয় এবং পাপের পথে টেনে নিয়ে যায়। তার চতুর্মুখী আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য দরকার শক্তিশালী রক্ষাকবচ। কোরআনে এমন একটি রক্ষাকবচের কথা এসেছে, যার প্রভাবে শয়তান মানুষের কাছে ঘেঁষতে পারে না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শয়তান নিজেই একবার এই সত্য স্বীকার করেছিল।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে রমজানের জাকাত হেফাজত করার দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন। এক ব্যক্তি এসে অঞ্জলি ভরে খাদ্যসামগ্রী নিতে লাগল। আমি তাকে পাকড়াও করে বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত করব। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি খুবই অভাবগ্রস্ত। আমার জিম্মায় পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে এবং আমার প্রয়োজন তীব্র। তিনি বললেন, আমি ছেড়ে দিলাম। যখন সকাল হলো তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু হুরায়রা! তোমার রাতের বন্দি কি করল? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! সে তার তীব্র অভাব ও পরিবার-পরিজনের কথা বলায় তার প্রতি আমার দয়া হয়। তাই তাকে আমি ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন, সাবধান! সে তোমার কাছে মিথ্যা বলেছে এবং সে আবার আসবে।

দ্বিতীয়বারও সে আসল এবং আবু হুরায়রা (রা.) তাকে ধরে ফেলল। সে আগের মতোই সবকিছু বলল। এ ছাড়া আরও বলল, এরপর আর আসবে না। তাই তিনি তাকে ছেড়ে দেন। রাসুল (সা.) বলেন, সে আবার আসবে।

সে তৃতীয়বারও আসল। যথারীতি আবু হুরায়রা (রা.) তাকে ধরে ফেলেন। তখন সে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাকে বলল, আমি আপনাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দেব। যা দিয়ে আল্লাহ আপনাকে উপকৃত করবেন। তা হলো, যখন আপনি রাতে শয্যায় যাবেন তখন আয়াতুল কুরসি পড়বেন। এতে আল্লাহর তরফ থেকে আপনার জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত হবে এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান আপনার কাছে আসতে পারবে না। এতে তিনি তাকে ছেড়ে দেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ভোরে আবু হুরায়রা (রা.)-কে বললেন, গত রাতে তোমার বন্দি কী বলল? তখন তিনি তা বললেন।

আসলে সাহাবায়ে কেরাম কল্যাণ অর্জনের জন্য বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। তা শোনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ, এ কথাটি তো সে তোমাকে সত্য বলেছে। কিন্তু হুঁশিয়ার, সে মিথ্যুক। হে আবু হুরায়রা! তুমি কি জানো, তিন রাত ধরে তুমি কার সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিলে? আবু হুরায়রা (রা.) বললেন, না। তখন তিনি বললেন, সে ছিল শয়তান। (সহিহ বুখারি ২৩১১) এই হাদিস থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও উপদেশ পাওয়া যায়।

আয়াতুল কুরসির শ্রেষ্ঠত্ব : সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতকে আয়াতুল কুরসি বলা হয়। এটা কোরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত। রাসুলুল্লাহ (সা.) সকাল-সন্ধ্যা এবং প্রতিটি ফরজ নামাজের পর এটি পাঠের তাগিদ দিয়েছেন। নিয়মিত আমলকারীর জন্য জান্নাতে সুসংবাদ দিয়েছেন। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি, মানসিক স্বস্তি এবং দৈনন্দিন জীবনের কল্যাণ। বিশেষ করে রাতে শয্যায় যাওয়ার আগে পাঠ করলে আল্লাহ রক্ষক নিয়োগ করেন। খুব ভালো হয় ঘুম। হৃদয়ে নামে প্রশান্তির বৃষ্টি।

শয়তানের প্রতারণার কৌশল : শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য সে কান্না, অসহায়তা ও দরিদ্রতার ভানও করে। স্বপ্নের মাধ্যমে বা সরাসরি কাউকে সে কোনো কিছু বললে তার উৎস যাচাই করা অপরিহার্য।

রাসুল (সা.)-এর অলৌকিক জ্ঞান : আবু হুরায়রা (রা.)-এর এই ঘটনাটি গভীর রাতে নির্জনে ঘটেছিল। তবু রাসুলুল্লাহ (সা.) দূরে থেকেও বিস্তারিত জেনেছেন এবং প্রকাশ করেছেন। এটা তার নবুয়তি মুজিজার স্পষ্ট প্রমাণ।

সাহাবাদের জ্ঞানপিপাসা : সাহাবায়ে কেরাম কল্যাণকর জ্ঞান ও আমল অর্জনে ছিলেন অদম্য। আবু হুরায়রা (রা.) অপরাধীকে ছেড়ে দিয়েছিলেন শুধু তার শেখানো উপকারী কথাগুলোর জন্য। এ থেকে তাদের জ্ঞান অন্বেষণের গভীরতা প্রকাশ পায়।