সমুদ্রের চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ আর বরফ। সুনসান নীরবতা। এ যেন বরফের মরুভূমি কিংবা বরফ জমা বিস্তীর্ণ দ্বীপ। এরই মাঝে বরফ ভেঙে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার। বিশেষায়িত এই জাহাজে চড়ে উত্তর মেরুর রোমাঞ্চকর অভিযান শেষ করেছেন বাংলাদেশের স্কুলশিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। আর্কটিক মহাসাগরের বুকে গেঁথে দিয়েছেন লাল সবুজের পতাকা। সঙ্গে ছিলেন আরও ২০ দেশের শিক্ষার্থী, বিজ্ঞানী ও পরমাণু বিশেষজ্ঞরা। টানা ৯ দিনের এই অভিযানে উত্তর মেরুর নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ, বিচিত্র প্রাণী দেখার সঙ্গে পারমাণবিক শক্তির বহুমুখী ব্যবহার আর জীবন গঠনের নানা শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে মাহমুদের ঝুলিতে। তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার আনন্দধাম গ্রামে। বাবা মো. বাহার আলীর ছেলে মাহমুদ রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র।
গত ১৩ আগস্ট রাশিয়ার মুরমানস্্ক থেকে সমুদ্রপথে পরমাণুশক্তিচালিত আইসব্রেকারে চড়ে উত্তর মেরু অভিযান শেষে ২২ আগস্ট সকাল ছয়টায় তাদের জাহাজটি আবার ফিরে আসে মুরমানস্কে। রাশিয়ায় বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনা এবং দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন শেষে গতকাল দুপুরে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন মাহমুদ। আজ সোমবার তিনি দেশে পৌঁছাবেন।
এই প্রথম দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে। তাও আবার পারমাণবিক জাহাজে চড়ে উত্তর মেরু অভিযান। কেমন ছিল সেই রোমাঞ্চকর অভিযান তা জানতে গত শনিবার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হয় মাহমুদের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে জানান, তার উচ্ছ্বাস আর নানা অভিজ্ঞতার কথা।
মাহমুদ বলছিলেন, ‘পৃথিবী যে কতটা বৈচিত্র্যময় তা এখানে না আসলে বুঝতাম না। এই অভিযান ছিল রোমাঞ্চকর, আনন্দময়, শিক্ষণীয়। নিজের কাছে এত ভালো লাগছে যে তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। মোবাইলসহ সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকলেও সবার সঙ্গে হৈ হুল্লোড় করে কখন যে সময় শেষ হয়ে গেছে কিছুই টের পায়নি। এই অভিযানে পরমাণু ও অন্যান্য বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান ভবিষ্যতে দেশের কাজে লাগানোর আপ্রাণ চেষ্টা করব।’
বাংলাদেশসহ ২১টি দেশের ৬৬ জন স্কুলশিক্ষার্থী এই অভিযানে অংশ নেয়। তাদের জাহাজটি উত্তর মেরুতে যাওয়া-আসা মিলিয়ে ২৪৪০ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিয়েছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় পরিচালিত এই রোমাঞ্চকর অভিযানে শিক্ষার্থীরা পরমাণুশক্তির বহুমুখী ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে উত্তর মেরুকে প্রভাবিত করছেÑ এমন নানা বিষয়ে জানার সুযোগ পেয়েছে। সেই সঙ্গে উত্তর মেরুর অনন্য প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে জানার অভূতপূর্ব সুযোগও তো ছিলই।
সেই মাহেন্দ্রক্ষণ : ১৭ আগস্ট রাত ২টা। সবাই গভীর ঘুমে। হঠাৎ ডাকাডাকি। তড়িঘড়ি করে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে কেবিনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে সবার চোখ ছানাবড়া। কারণ মাহমুদদের বহনকারী জাহাজটি পৌঁছে গেছে উত্তর মেরুতে। চোখ ভরা উচ্ছ্বাস আর বিপুল উৎসাহে কেবিন থেকে সবাই বেরিয়ে পড়ে। এরপর একে একে জাহাজ থেকে নামানো হয় সমুদ্রের বুকে জমে থাকা বিশাল পুরু ও শক্ত বরফের ওপর।
‘বরফের ভার বহন সক্ষমতা পরীক্ষা করে ধীরে সবাইকে সেখানে নামানো হয়। সাউন্ডবক্সে বেজে ওঠে বাংলাদেশসহ অংশগ্রহণকারী সব দেশের জাতীয় সংগীত। উত্তর মেরুতে ‘আমার সোনার বাংলা’ বাজতে শুনে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে। নেমেই সেখানে লাল সবুজ পতাকা গেঁথে দেয় বরফের বুকে। অন্য দেশের শিক্ষার্থীরাও তাদের পতাকা পুঁতে দেয়। দলবেঁধে হৈ হুল্লোড় আনন্দের কিছুক্ষণ পর সবাইকে আবার জাহাজে তোলা হয়,’ বলছিলেন মাহমুদ।
তিনি জানান, ‘বরফগুলো ছিল বেশ শক্ত ও পিচ্ছিল। তাই আমাদের বেশ সতর্কতার সঙ্গে হাঁটাহাঁটি করতে হচ্ছিল। রাত ২টা থেকে সন্ধা ৬টা পর্যন্ত বহনকারী জাহাজটি উত্তর মেরুতেই অবস্থান করছিল। এ সময় তিনবার তাদের জাহাজ থেকে নামানো হয়। এখানে ২৪টি টাইমজোনের মধ্যে ঘুরে আসারও সুযোগ পেয়েছি আমরা।’
আসা-যাওয়ার পথের দৃশ্য : উত্তর মেরুতে যাওয়ার পথে একটি এবং ফেরার পথে আরেকটিসহ মোট দুইটি সাদা ভালুক দেখার সুযোগ হয়েছে মাহমুদদের। বিস্তীর্ণ বরফাঞ্চলের ওপর সাদা রঙের ভালুকের শুয়ে থাকার দৃশ্য সবাই বেশ উপভোগ করেছে। সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে ভুল হয়নি তাদের।
বিস্ময়কর এই অভিযান নিয়ে মাহমুদ আরও জানান, পরম করুণাময় আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহেই এটা সম্ভব হয়েছে। এটি ছিল সত্যিই এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ২১ দেশের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হওয়া, তাদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ মিলেছে। আমার বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সেই সময় আমি কখনোই ভুলব না। আমার একমাত্র দুঃখ হলো, জানি না আমি আর কখনো তাদের দেখা পাব কি না। আমার বাবা-মা এবং রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আশা করি, মহান আল্লাহ এ ধরনের সুযোগ সবার জন্য করে দেবেন।
লাখো পাখি দেখার বিরল সুযোগ : ফেরার পথে ফ্রাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ডে কয়েক লাখ পাখি দেখার সুযোগ হয়েছে মাহমুদদের। এই দ্বীপের চারদিকে জাহাজে করে ঘোরানো হয় তাদের।
১৮৭৩ সালে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির যৌথ অভিযানে উত্তর মেরুতে এসে অভিযাত্রী জুলিয়াস ভন পেয়ার এবং কার্ল ওয়েপ্রেক্ট আর্কটিক সাগরের দ্বীপপুঞ্জটি আবিষ্কার করেন। ১৯১ দ্বীপ নিয়ে জায়গাটা ছবির মতো সুন্দর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির আর্কটিক প্রাণী, পাখি, ডলফিন, তিমি ইত্যাদির দেখা মেলে এখানে।
মাহমুদ জানান, সেখানে ছোট ছোট কিছু গাছ আর পাথর ছাড়া মানুষের কোনো অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। কিছু কুঁড়েঘর থাকলেও তাতে মানুষের উপস্থিতি ছিল না। তবে সেখানে লাখো পাখির দেখা মেলে। চারপাশে তাকিয়ে মনে হলো সত্যিই পাখির রাজ্যে ঢুকে পড়েছি। একসঙ্গে এত পাখি জীবনে দেখিনি! পাখির কিচিরমিচিরে কান পাতা দায়। লাখ লাখ পাখির বাসা এই দ্বীপে। ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে বাসায় ঢুকছে আর বের হচ্ছে।
জাহাজে ভাসা জীবন : জাহাজের মধ্যে প্রতিদিনের রুটিন কেমন ছিল জানতে চাইলে মাহমদু জানান, এটা বৈচিত্র্যময় ছিল। তবে সাধারণত সকাল সাড়ে ৭টায় ঘুম থেকে ওঠে এরপর ব্যায়াম এবং সকালের নাশতা শেষ করতে হতো। সাড়ে ৯টার দিকে দিনের কর্মপরিকল্পনা জানিয়ে দেওয়া হতো সবাইকে। ১০ থেকে ১২টা পর্যন্ত শিক্ষণীয় নানা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের লেকচার শুনতাম। যেখানে থাকত পারমাণবিক শক্তির বহুমুখী ব্যবহার ও জীবন গঠনের নানারকম শিক্ষা। এরপর কিছু সময় খেলাধুলা এবং দুপুর ১টা থেকে ২টার মধ্যে দুপুরের খাওয়া শেষ হতো। কিছু সময় বিশ্রাম বা নিজেদের মধ্যে গল্প গুজবের পর বেলা ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত থাকত নানারকম কুইজ ও লেকচার। বিকেল ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত অবসর। সন্ধ্যায় শুরু হতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেখানে থাকত নাচ, গান, ডিস্কো, যেমন খুশি তেমন সাজা আরও কত কিছু। এসব শেষে রাতের খাবার থেকে তাদের ঘুমিয়ে পড়তে হতো রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে।
এর ফাঁকে জাহাজের বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে দেখানো এবং কোন যন্ত্রপাতির কী কাজ তা বোঝানো হয়েছে তাদের। জাহাজের মধ্যে কোনো ইন্টারনেট, বা মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না। তবে স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে নাবিকেরা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে পারেন। অর্থাৎ বাইরের সঙ্গে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে কোনোরকম সংযোগ ছাড়াই সময় কেটেছে মাহমুদদের।
রোসাটমের আমন্ত্রণে অন্য অভিভাবকদের মতো মাহমুদের বাবা মো. বাহার আলীও গিয়েছিলেন রাশিয়াতে। ছেলে উত্তর মেরুর উদ্দেশ্যে জাহাজে তুলে তিনি সেদেশেই ছিলেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা টানা ৯ দিন পর ছেলের দেখা পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন বাহার আলী।
নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ রকম আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে ছেলে সুযোগ পাওয়ায় খুবই গর্বিত ও আনন্দিত। মহান আল্লাহপাকের অশেষ রহমত ছাড়া এই জয় অর্জন ছিল অসম্ভব। ধন্যবাদ জানাই রোসাটম এবং রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকদের।
‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ নামে অনলাইনে তিন ধাপে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় গত ২৮ এপ্রিল। প্রথম ধাপে বিদেশি শিক্ষার্থীরা একটি বিজ্ঞানসংক্রান্ত কুইজে অংশ নেয়। দ্বিতীয় ধাপে তাদের বেশ কয়েকটি ওয়েবিনারে অংশ নিতে হয়, যার মূল বিষয়বস্তু ছিল রোসাটমের যুগান্তকারী প্রযুক্তি ও উত্তর মেরু অভিযানে ব্যবহৃত জাহাজের প্রযুক্তি। এসব ওয়েবিনারের ভিত্তিতে আরেকটি পরীক্ষা নেওয়া হয়। চূড়ান্ত পর্বে তাদের একটি ভিডিও প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে বলা হয়, যার মূল বিষয় ছিল কীভাবে নিজ দেশের জনগণের জীবনযাত্রার উন্নয়নে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতে পারে। একটি আন্তর্জাতিক বিচারক প্যানেল প্রেজেন্টেশনগুলো মূল্যায়ন করে শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করে।
পৃথিবীর অন্যতম পরমাণু শক্তিধর দেশ রাশিয়া। পরমাণুশিল্পের বহুমুখী ব্যবহার ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশটি অনেকটা পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় রয়েছে। রাশিয়া তাদের পরমাণুশক্তির নানামুখী ব্যবহার এবং এ সংক্রান্ত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে দিতে চায়। সেজন্য প্রায় বছর জুড়ে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও অন্যদের নিয়ে নানা আয়োজন করে। এর একটি অংশ হলো আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক প্রকল্প ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’। প্রকল্পটির আওতায় পরমাণু শক্তিচালিত আইসব্রেকারে করে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে উত্তর মেরুতে এই অভিযান পরিচালিত হয়। ষষ্ঠবারের মতো এই অভিযান চলছে। এ ধরনের আয়োজন বিশ্বের আর কোথাও হয় না। গত ছয় বছরে বিভিন্ন দেশের ৩৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী এই অভিযানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বে একমাত্র রাশিয়ারই নিজস্ব পরমাণু শক্তিচালিত আইসব্রেকারের বহর রয়েছে। এই বহরে মোট আটটি পরমাণু আইসব্রেকার রয়েছে।