দক্ষিণ এশিয়ার কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। এমনকি এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আফগানিস্তানেরও নিচে। বর্তমানে এ অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। কোনোভাবেই এটি বাড়ানো যাচ্ছে না। অব্যাহতির সংস্কৃতি এই কম কর-জিডিপি অনুপাতের অন্যতম প্রধান কারণ। আবার কর আদায়ের ক্ষেত্রে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি। ফলে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ধনীদের সমান করভার বহন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে কর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা জরুরি। সেটি করার জন্য বিদ্যমান রাজস্ব ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার দরকার।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘করপোরেট কর ও ভ্যাট ব্যবস্থায় সংস্কার : এনবিআরের জন্য ন্যায্যতা প্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর লেকশোর হোটেলে গতকাল মঙ্গলবার আয়োজিত সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ ও এনবিআরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সিপিডি পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, ৮২ শতাংশ ব্যবসায়ী বর্তমান কর হারকে ‘অন্যায্য’ ও ব্যবসার উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা বলে মনে করেন। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ কর কর্মকর্তাদের জবাবদিহির অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৭২ শতাংশ বলেছেন, কর প্রশাসনে দুর্নীতি তাদের জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আবদুর রহমান বলেন, কর-ছাড়ের ব্যাপকতা বেড়ে যাওয়ায় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। যথেষ্ট পরিমাণ কর আদায় করতে না পারলে বিপদ আছে। তিনি বলেন, প্রত্যেক ক্ষেত্রে ডিজিটালব্যবস্থা চালু হয়ে গেলে সহজেই কর ও ভ্যাট রিটার্ন পাওয়া যাবে।
স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বা অটোমেশন চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত ভ্যাট নিরীক্ষা বন্ধ থাকবে বলে মন্তব্য করেন এনবিআরের চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা যেন কোনোভাবেই মনে না করেন, অহেতুক হয়রানি করার জন্য এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কাজ হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা একটি একক ভ্যাট হার নির্ধারণ করতে চাই। কিন্তু এতে ব্যবসায়ীরাই বাধা হয়ে দাঁড়ান। এখন ভ্যাট দিতে কারও কাছে যেতে হয় না। এক ক্লিকেই নিজের সিস্টেম থেকে ভ্যাট দেওয়া যায়।’
কর-ছাড় নিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, ‘কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আমরা কর-ছাড় দিয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানাই। কিন্তু দেখা যায়, আট বছরের জন্য কর-ছাড়ের কথা হলেও ৪০ বছর পর্যন্ত সেই ছাড় চলতে থাকে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা আছে, যেটা স্বীকার করে নিয়েই আমাদের এগোতে হবে।’ তার মতে, বিদেশি ঋণের বোঝা অনেক বেড়েছে।
চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, কোনো সন্দেহ নেই ন্যূনতম কর একটা কালাকানুন। এটি স্বীকার করতেই হবে। ব্যবসায় কর হবে মুনাফার ওপর। তা না করে ন্যূনতম কর নির্ধারণ করছি। সমস্যা হচ্ছে, এগুলো ঠিক করতে গেলে আমাদের কর আহরণ কমে যাবে। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা আমার একটি নতুন প্রকল্প নিয়েছি। আমরা চাই, অটোমেটেড এনবিআর। সবকিছু যদি ডিজিটাল করতে পারি, তাহলে বোতাম টিপলেই ভ্যাট রিটার্ন ও কর রিটার্ন হয়ে যাবে।’
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কর আহরণের কোনো বিকল্প নেই। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। কিন্তু সেই রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে যেন ন্যায্যতা পরিহার করা না হয়, সেটি নিশ্চিত রতে হবে। রাজস্ব আহরণের নতুন নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে হবে। ধীরে ধীরে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়াতে হবে। আর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত থেকে যে রাজস্ব আহরণ হয়, সেটি যেন সংশ্লিষ্ট খাতের উন্নয়নেই ব্যয় করা হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
সিপিডি পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থিত ১২৩টি প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত এ সমীক্ষায় দেখা যায়, ৬৫ শতাংশ ব্যবসায়ী নিয়মিত কর দাবিকে কেন্দ্র করে কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, যথাযথ ব্যাখ্যা বা পূর্বাভাস ছাড়াই কর কর্মকর্তারা অনেক সময় ইচ্ছামতো কর আরোপ করেন।
ভ্যাট বিষয়ে অংশগ্রহণকারী ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, জটিল ভ্যাট আইন তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। এ ছাড়া অস্পষ্ট ভ্যাট নীতিমালা, কর কর্মকর্তাদের সীমিত সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার ঘাটতি, পণ্য ও সেবার শ্রেণিবিন্যাসে জটিলতা এবং উচ্চ অনুবর্তন ব্যয় ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এন্টারপ্রাইজ সার্ভের কাঠামো অনুসরণ করে পরিচালিত এ ভ্যাট সমীক্ষায় ঢাকা, আশপাশের জেলাসহ ৩৮৯টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
মুক্ত আলোচনায় সাবেক অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ব্যক্তির অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। করপোরেটের ক্ষেত্রে দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। শিক্ষা ও শিক্ষার ব্যবসা আলাদা করে করের চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।
আলোচনায় ট্যাক্স বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ এইচ মাহবুব সালেকিন বলেন, ‘কর অফিসে দুর্নীতি একটু বেশি। যদি আমাদের মামলাগুলো দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সমাধান করা যেত, তাহলে রাজস্ব আহরণ বেশি হতো। তাহলে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভর করা লাগত না। এনবিআর চেয়ারম্যানের এ বিষয়ে আন্তরিকতা দেখা গেছে।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট জাহিদ হাসান বলেন, করদাতা যখন কোনো কর অফিসে যান, তখন তাকে একটা ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হবে।