পাঁচ মন্ত্রী পারেননি পেরেছেন বশির

ঘটনাটি ২০০৯ সালের। তখন বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী ছিলেন জিএম কাদের। কিন্তু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পরিচালনায় মন্ত্রীর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ, বিমান পরিচালনা করে পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ড। জিএম কাদেরকে পাশ কাটিয়ে সেই পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান জামালউদ্দিনকে। এ নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছে।

গত ১৬ বছরে জিএম কাদের ছাড়াও বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন ফারুক খান, রাশেদ খান মেনন, একেএম শাহজাহান কামাল ও মাহবুব আলী। তারা মন্ত্রী হিসেবে প্রত্যেকেই পর্ষদের চেয়ারম্যান হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। ১৬ বছর পর তা পেরেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

জিএম কাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব মন্ত্রীর হাতে রাখার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাতে সম্মতি দেননি প্রধানমন্ত্রী। মূলত প্রধানমন্ত্রী তার নিজস্ব লোক দিয়ে বিমান পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। এ কারণে মন্ত্রীর হাত থেকে এ দায়িত্ব কেড়ে নিয়ে জামালউদ্দিনকে দিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় পর্ষদের মাধ্যমে বিমানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং থেকে ১০টি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া চলছিল। এ ছাড়া প্রায় প্রতি বছরই উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া হতো। উড়োজাহাজ কেনা, লিজ নেওয়া এবং এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এগুলো নিয়ে নানা তছরুপের অভিযোগ রয়েছে।

এভাবে শুধু জিএম কাদের নন, এরপর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যত মন্ত্রী হয়েছেন, সবাই চেয়েছেন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কাউকেই সে দায়িত্ব দেননি। ১৬ বছর পর এসে পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। গত মঙ্গলবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনকে বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হয়। একইদিন মুয়ীদ চৌধুরীকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। মুয়ীদ চৌধুরী শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় এ দায়িত্ব পালন করতে চাননি। আর এ সুযোগে শেখ বশিরউদ্দীনকে চেয়ারম্যান করা হয়।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিমানকে করপোরেশন থেকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করা হয়। করপোরেশন থাকাকালে পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান হতেন মন্ত্রী। এমনকি ২০০৭ সালে কোম্পানি করার পরও চেয়ারম্যান ছিলেন মাহবুব জামিল। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার মন্ত্রী পদমর্যাদার স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধ্যায় শেষে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসে। এ সময় বিমান পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় মহাজোট সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টির জিএম কাদেরকে। মূলত জিএম কাদেরকে একক কর্তৃত্ব না দেওয়া এবং বিমানের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে রাখার উদ্দেশ্যেই জিএম কাদেরকে পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কিন্তু জিএম কাদের দফায় দফায় এই কর্তৃত্ব চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মন্ত্রীর একটা দায়বদ্ধতা আছে। কিন্তু বেসরকারি ব্যক্তি যাকে চেয়ারম্যান করা হয়েছে, তার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তাছাড়া বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। মন্ত্রীর যদি সেই এয়ারলাইনস পরিচালনার ক্ষমতাই না থাকে, তাহলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু এত কিছুর পরও প্রধানমন্ত্রী জিএম কাদেরকে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করেননি। একপর্যায়ে বিমানের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি জায়গা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হলে ২০১১ সালের ৭ ডিসেম্বর জিএম কাদেরের কাছ থেকে বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বই কেড়ে নেওয়া হয়। সেখানে বসানো হয় আস্থাভাজন ফারুক খানকে। আর জিএম কাদেরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে।

জিএম কাদেরের পর বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যত মন্ত্রী হয়েছেন, তারা সবাই বোর্ডের চেয়ারম্যান হতে চেয়েছিলেন। ফারুক খানের পর বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান রাশেদ খান মেনন। তিনিও পরিচালনা পর্ষদে মন্ত্রীর অন্তর্ভুক্তি দাবি করেছিলেন। রাশেদ খান মেননের পর একেএম শাহজাহান কামাল ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি বিমানমন্ত্রী হন। তিনি ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এক বছরের মন্ত্রিত্বকালে তিনিও পরিচালনা পরিষদের কর্তৃত্ব চেয়েছিলেন। এরপর ২০১৯ থেকে ’২৪ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন মাহবুব আলী। উত্তরসূরিদের মতো তিনিও বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব চান। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো মন্ত্রীকেই সেই দায়িত্বে রাখেননি।

জিএম কাদেরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয়েছিলেন জামালউদ্দিন। তাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সাপোর্ট দেওয়া হতো। এর দেখাদেখি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবরাও মন্ত্রীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এতে জিএম কাদের কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। কেনাকাটা ছাড়াও বিমানে জনবল নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম হয়। তাছাড়া বিমান প্রায়ই শিডিউল অনুসরণ করতে পারত না। বিশে^র নানা প্রান্তে যাত্রীরা আটকা পড়তেন। এসব নিয়ে সংসদে এবং সংসদীয় কমিটিতে জিএম কাদেরকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনকে চেয়ারম্যান করায় বিমানে কী প্রভাবে পড়বে জানতে চাইলে বিমানের একজন পরিচালক বলেন, দৃশ্যত কোনো প্রভাবই পড়বে না। চেয়ারম্যান বোর্ডের সভাগুলোতে অংশ নেবেন, এই যা। তিনি দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা করতে পারবেন না। কারণ, ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন হলে তাকে বিদায় নিতে হবে। তার নিয়োগে একটাই লাভ হতে পারে আর তা হচ্ছে পরবর্তী সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে পর্ষদের চেয়ারম্যান করতে পারে। মন্ত্রী বা উপদেষ্টার হাতে কেন পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থাকবে, তা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু মন্ত্রী চেয়ারম্যান থাকলে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। বিমান পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয় অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের।