রোজার আগেই ভোটের ছক

নির্বাচন নিয়ে শর্ত, সংশয় ও সন্দেহের মধ্যেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ বা রূপরেখা (কর্মপরিকল্পনা) ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করছে কমিশন। রোডম্যাপে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ, ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং দেশীয় পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন চূড়ান্তকরণসহ ২৪টি কার্যক্রমকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এ রোডম্যাপ ঘোষণা করেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। এরপর তিনি রোডম্যাপের নানা বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

তফসিল ও ভোট কবে হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘ভোটগ্রহণের ৬০ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, আগামী রমজানের আগে ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। আমার যদি ভুল না হয়, তাহলে ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারি রমজান শুরু। সে হিসাবে তফসিল ঘোষণা ও ভোটের আয়োজন করা হবে।’

রোডম্যাপ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ করবে ইসি। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সুশীল সমাজ, নারী প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা এ সংলাপে অংশ নেবেন। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে।

নির্বাচনী আইনবিধি নিয়ে রোডম্যাপে বলা হয়, ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২, সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধি-২০২৫, নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা (সংশোধন), নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন-১৯৯১ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন-২০০৯ এ পাঁচটি আইনের কাজ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করা হবে।’

ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিষয়ে রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ‘দ্বিতীয় ধাপের সম্পূরক খসড়া ভোটার তালিকা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, যা ৩১ আগস্টের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে ১ নভেম্বর এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ৩০ নভেম্বর।’

এ ছাড়া  সীমানা নির্ধারণ নিয়ে ইতিমধ্যে শুনানি শেষ হয়েছে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংসদীয় আসনের সীমানা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করবে ইসি। একই সঙ্গে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জিআইএস ম্যাপ প্রস্তুত ও প্রকাশ করা হবে।

রোডম্যাপ অনুযায়ী, নির্বাচনে পর্যবেক্ষক নিবন্ধন ২২ অক্টোবরের মধ্যে চূড়ান্ত করে ১৫ নভেম্বর নিবন্ধন সনদ প্রদান করা হবে। বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের অনুমতি প্রদানের যাবতীয় কার্যক্রম ১৫ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করা হবে। এ ছাড়া, ১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচনী তথ্য প্রচারের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয়, টিঅ্যান্ডটি, বিটিআরসিসহ বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানির সঙ্গে সভা করবে ইসি।

রোডম্যাপে আরও বলা হয়, নির্বাচনী ম্যানুয়াল, নির্দেশিকা, পোস্টার ইত্যাদির মুদ্রণ ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করা হবে। নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ২৯ আগস্ট থেকে ভোটগ্রহণের চার থেকে পাঁচ দিন আগে পর্যন্ত সম্পন্ন করবে ইসি। নির্বাচনের সব ধরনের মালপত্র সংগ্রহ ও বিতরণ কার্যক্রম ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। ব্যবহারযোগ্য স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স চূড়ান্ত করা হবে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে।

১৫ নভেম্বরের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাজেট চূড়ান্ত করা হবে বলেও রোডম্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে বৈঠক ১৬ থেকে ২০ নভেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের জন্য জনবল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাসংক্রান্ত সব কার্যক্রম ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করতে চায় ইসি। এ ছাড়া, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল প্রস্তুতি ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম সভা ২৫ সেপ্টেম্বর হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য কার্যক্রম ধাপে ধাপে গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে। আইসিটি-সংক্রান্ত সব কাজ ৩১ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করতে চায় কমিশন।

পোস্টাল ভোটিংয়ের বিষয়ে কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়, প্রকল্প অনুমোদন, সফটওয়্যার চূড়ান্তকরণ, মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, নিবন্ধন ও ট্র্যাকিং মডিউল, প্রচারণা অক্টোবরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। প্রবাসে নভেম্বরে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। কারাবন্দিদের ভোটের জন্য ব্যালট পেপার ভোটের দুই সপ্তাহ আগে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্মপরিকল্পনায় চ্যালেঞ্জের বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা না হলেও ইসি সচিব বলেন, ‘প্রতিটি বিষয়ই চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি বিষয় মোকাবিলার জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। এটাই দৃঢ়তা, এটাই আমরা চাই। আপনারা যদি অনুমান করেন আগামীতে কোনো সমস্যা থাকতে পারে, সেটা আমাদের জানান। আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। পরিস্থিতি আসবে, পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। এটাই চ্যালেঞ্জ।’

চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেন থাকবে না? এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়। আমাদের কাজ হচ্ছে নির্বাচন-সংক্রান্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।’

গণপরিষদ ও গণভোটের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা জাতীয় নির্বাচনের জন্য। সংসদ নির্বাচনের বাইরে আমাদের অন্য কিছু ভাবার সুযোগ নেই।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব জানান, হেলিকপ্টার সহায়তার প্রয়োজন হবে এমন ভোটকেন্দ্র বাছাই করে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র, কক্ষ সংখ্যা, নিকটবর্তী হেলিপ্যাড, যাত্রা শুরু ও শেষ এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য তথ্য জানানোর জন্য তফসিল ঘোষণার দুই মাস আগে জেলা নির্বাচন অফিসার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।