আমরা জানি, পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগই পানি। তার মধ্যে মহাসাগর পাঁচটি আর সাগর রয়েছে ২৭টি। আনাচে-কানাচে এঁকে বেঁকে লুকিয়ে থাকা নদ-নদীর হিসাব দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়! তবে বাংলাদেশে নদ-নদীর হিসাবটা দেওয়া যেতেই পারে, ৯০৭টি।
বিজ্ঞানীদের ধারণামতে, সমুদ্রের বিশাল জলরাশির মাত্র পাঁচ শতাংশ আমরা জানতে পেরেছি। বিশাল এই জলরাশির বাকি ৯৫ শতাংশই আমাদের অজানা। আর এই পাঁচ শতাংশের মধ্যেই প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার প্রজাতি মাছের বসবাস রয়েছে। এই হাজার হাজার মাছ হাজার বৈশিষ্ট্যে অনন্য, সেইল ফিশ তেমনই একটি অদ্ভুত ও রহস্যময় গুণ ধারণকারী মাছ।
সেইল ফিশের পিঠে বেশ বড়সড় পাখনা রয়েছে। যা দেখতে নৌকার সেইল বা পালের মতো হওয়ায় একে সেইল ফিশ বা পালতোলা মাছ বলা হয়। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সেইল ফিশের বৈজ্ঞানিক নাম Istiophorus platypterus। সেইল ফিশের আরেকটি জাত রয়েছে আটলান্টিক সেইল ফিশ (Istiophorus albicans)।
এ মাছটির পিঠের পালটি যখন উত্তোলন করা হয় তখন প্রায়ই পেছনের পুরো দৈর্ঘ্য জুড়ে প্রসারিত হয়। এবং ঠোঁটের উপরিভাগ লম্বা ও তীক্ষè, যা দিয়ে খুব সহজেই শিকারীকে আক্রমণ করতে পারে। পালতোলা মাছ পৃথিবীর সব মহাসাগরের ঠা-া পেলাজিক পানিতে বাস করে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ন্যাশনাল ওশান সার্ভিসের তথ্যমতে, অনেক মৎস্য বিশেষজ্ঞের মতে, সেইল ফিশ মহাসাগরের সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রাণী। মাছটির ওপরের পাখনা বড় ও নরম হওয়ায় এরা ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে, এই গতি ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
সেইল ফিশ ১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। প্রশান্ত মহাসাগরের সেইল ফিশ ১০০ কিলোগ্রাম ও আটলান্টিক মহাসাগরের প্রজাতি ৬০ কিলোগ্রাম পর্যন্তও হয়ে থাকে। এরা সাধারণত উষ্ণ জলজ পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে। এরা দলবদ্ধভাবে খাবার সংগ্রহ করে। সেইল ফিশ উড়ুক্কু, টুনা, ম্যাকরল মাছ প্রভৃতি শিকার করে খেয়ে জীবনধারণ করে এবং এরা শিকারের কাছে এসে নিজেদের রঙও পরিবর্তন করতে পারে।
অনেক বিজ্ঞানীর মতে, পালতোলা মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এরা এক বছরে দৈর্ঘ্যে ১.২-১.৫ মিটার (৪-৫ ফুট) পৌঁছায়। সেইল ফিশ সর্বোচ্চ ৩৫ মি./সেকেন্ড (১২৫ কিমি/ঘণ্টা) সাঁতারের গতিতে পৌঁছায় বলে অনুমান করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, সেইল ফিশ ১০-১৫ মি./সেকেন্ডের (৩৫-৫৫ কিমি/ঘণ্টা) মধ্যে গতি অতিক্রম করতে পারে না। তবে শিকার ধরার সময় সেইল ফিশ ৭ মি/সেকেন্ড (২৫ কিমি/ঘণ্টা) বিস্ফোরণ গতিতে পৌঁছে। সাধারণত সেইল ফিশ দৈর্ঘ্যে ৩ মিটার (১০ ফুট) এবং ওজনে ৯০ কিলোগ্রাম (২০০ পাউন্ড) পর্যন্ত হয়।
সেইল ফিশ সাঁতার কাটা ও বিচরণ করার সময় তার পাল ভাঁজ করে রাখে। তার পাল তখনই তোলে যখন শিকারিকে আক্রমণ করে। আক্রমণের সময় উঁচু পাল তুলে ক্রমাগত ঝাঁকাতে থাকে বলে আক্রান্ত মাছ ঠোঁট দেখতে পায় না। এই কৌশলটি সেইল ফিশকে তাদের ঠোঁট মাছের ঝাঁকের কাছাকাছি বা এমনকি তাদের মধ্যে রাখতে সাহায্য করে, বর্শার মতো লম্বা ও ধারালো ঠোঁটের উপরিভাগ দিয়ে সহজেই শিকারের শরীর বিদ্ধ করে নেয়। সেইল ফিশ প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের গ্রীষ্মম-লীয় এবং নাতিশীতোষ্ণ জলের মহাদেশীয় উপকূল, দ্বীপ এবং প্রাচীরের কাছে বেশি দেখা যায়।
সেইল ফিশ সেসব মাছ শিকার করে খায় যে মাছগুলো প্লাঙ্কটন খেয়ে বেঁচে থাকে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক সেইল ফিশ খোলা সমুদ্রের হাঙ্গর প্রজাতি এবং অর্কাসের মতো বৃহত্তর শিকারি মাছ ছাড়া অন্য কিছু খায় না।