যুক্তরাষ্ট্রকে পাত্তা দিচ্ছে না ভারত!

এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার ভারত-যুক্তরাষ্ট্র এখন মুখোমুখি অবস্থানে। এর নেপথ্যের কারণ ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্ক। সাম্প্রতিক সময়ে এই শুল্ককে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমশ শীতল হচ্ছে। এমনকি নিজের ভালো বন্ধু হিসেবে দাবি করা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও এখন আর সম্পর্কের পুরনো উষ্ণতা নেই ট্রাম্পের। ইতিমধ্যে ট্রাম্পের শুল্ক উপেক্ষা করেই রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই উত্তেজনার সুযোগকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে ভারতের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের শুরুতে যখন চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্র করছিলেন, তখনই নীরবে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা শুরু করে বেইজিং। শুক্রবার ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৫-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি বদলাচ্ছে। আগে চীন নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও এখন ভারত ও চীন প্রায় একই সুরে কথা বলছে। তবে এ পরিবর্তনকে স্থায়ী ভাবা যাবে না, কারণ ভূ-রাজনৈতিক মৌলিক বিষয়গুলো এখনো অপরিবর্তিত।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে ব্যক্তিগতভাবে একটি গোপন চিঠি পাঠিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে নাম পরিচয় না জানিয়ে এক ভারতীয় কর্মকর্তাকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, চিঠিটি চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক মেরামতের ইচ্ছা পরীক্ষা করে দেখার জন্য পাঠানো হয়েছিল। যদিও চিঠি রাষ্ট্রপতি মুর্মুরকে কাছে পাঠানো হয়েছিল, তারপরও চিঠিটির বার্তা দ্রুতই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পৌঁছায়। চিঠিতে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তি বেইজিংয়ের স্বার্থে ক্ষতিকর হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জুনে মোদি সরকার চীনের এই উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে। যদিও তখন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত ছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট বেইজিংয়ের উদ্যোগ পরিচালনার জন্য একজন প্রাদেশিক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন।

সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। সেই সফরে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং সীমান্ত সংকট দূর করতে উদ্যোগী হওয়ার কথা জানিয়েছে দুই দেশই। এরপরই দুই দেশ নিজেদের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয়। বেইজিং ভারতকে ইউরিয়া সরবরাহে বিধিনিষেধ শিথিল করে। ভারতের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা চীনা নাগরিকদের পর্যটন ভিসাও পুনরায় চালু করা হয়। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়েই ভারত-চীন ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পরেও সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করতে সম্মত হয়। দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি সীমান্ত বিরোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দেয়, যা দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে চীনের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প হঠাৎ ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়ে সেই কৌশলকেই দুর্বল করে দিয়েছে। অদ্ভুত হলেও, সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের সূচনা ট্রাম্পের শুল্ক নীতি থেকেই হয়েছে, যা মূলত বেইজিং এবং পরে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে ছিল। মার্চে ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করার পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতকে আহ্বান জানায় ‘আধিপত্যবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতির বিরোধিতা’ করার জন্য। শি নিজেই বলেন, হাতি ও ড্রাগনকে একসঙ্গে নাচানোই একমাত্র সঠিক পথ। জুলাইয়ে চীনা কর্মকর্তারা একই রূপক ব্যবহার করতে থাকেন। রাষ্ট্রায়ত্ত দৈনিক গ্লোবাল টাইমস আরেক ধাপ এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক মোকাবিলা করতে দুই এশীয় শক্তির মধ্যে ‘ব্যালে নৃত্য’ করার আহ্বান জানায়।

ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, মোদি এ সপ্তাহে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য চীনে যাবেন। সেখানে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। এটি প্রধানমন্ত্রী মোদির চীনে সাত বছরের বেশি সময় পর প্রথম সফর। এর আগে তারা শেষবার গত বছরের রাশিয়ার কাজান শহরে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে সাক্ষাৎ করেছিলেন। চীনা-গ্লোবাল সাউথ প্রজেক্টের প্রধান সম্পাদক এরিক ওল্যান্ডার রয়টার্সকে বলেন, শি সম্মেলনকে ব্যবহার করবেন এটি দেখানোর জন্য যে; যুক্তরাষ্ট্র-পরবর্তী নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কেমন হতে পারে এবং জানুয়ারি থেকে হোয়াইট হাউজের চীন, ইরান, রাশিয়া ও ভারতের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।

গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো খবর দিয়েছে, শুল্ক বিরোধ নিয়ে আলোচনার সময় ট্রাম্প মোদিকে ‘চারবার’ ফোন দিলেও তাতে সাড়া দেননি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি যে রুশ তেল ক্রয়কে নিয়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের শুরু, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনকে খুশি করতে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি নয়াদিল্লি। উল্টো ভারত তার প্রতিনিধিদলকে রাশিয়া পাঠিয়েছে, এ বিষয়ে আলোচনা করতে এবং সেখান থেকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের প্রধান জানিয়েছেন, যেখানে দাম কম পাবে সেখান থেকেই তেল কিনবে দিল্লি। সব মিলিয়ে এশিয়া অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এতদিন যুক্তরাষ্ট্র যে সুবিধা পেত, সে দৃশ্যে যে বদল আসছে তা অনেকটাই নিশ্চিত।