রকমারি হাজারো বৃক্ষশোভিত, পাখির কলতানমুখর, ফুলের রাজত্বনির্ভর, জলের ছন্দ এবং প্রাণবন্ত সবুজের এক নৈসর্গিক ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত এ বিদ্যাঞ্চল। দীর্ঘ তেত্রিশ বছর পর এখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাকসু নির্বাচন। ফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন শুধু ভোটের আয়োজনই নয়, এটি আমাদের চোখে অধিকার, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবিও। উল্লেখ্য, নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে ১০ জন, সাধারণ সম্পাদক পদে ৯ জন এবং সাহিত্য ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ৮ জনসহ মোট ২৫টি পদে ১৭৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যই গবেষণা, সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন। আর শিক্ষার্থী সংসদ শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু দেখা যায় যে, দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ঘটে ঠিক তার বিপরীত ও নির্মম অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমি মনে করি আমাদের শিক্ষার্থী সংসদ নারীর পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। অর্থাৎ, নারী ওড়না ব্যবহার করবেন নাকি করবেন না, টপস পরবেন নাকি অন্যকিছু, আর চা পান স্টলে করবেন নাকি বাসায় তা নির্ভর করবে একান্তই তার আপন ইচ্ছার ওপর। আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় চিন্তায় অন্তত শত বছর এগিয়ে থাকে আর সাধারণ মানুষের থেকে তো আরও বেশি। ফলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অন্ধ ও সেকেলে ভাবনার মানুষ বা সেই মানুষদের ভাবনা দ্বারা চালিত হবে না। জাবিকে দেখতে চাই লিঙ্গনির্বিশেষে সবার জন্য একটি সুখকর জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে।
পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষই স্বতন্ত্র। ফলে চিন্তাও বিচিত্র। তাই সবার সব বৈশিষ্ট্য ও কাজ সবার ভালো লাগবে না। এক্ষেত্রে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের চলন-বলন অপছন্দ হলেই অতর্কিত হামলা, কটুবাক্য নিক্ষেপ ও নেতিবাচক হিসেবে তাকে প্রকাশ ও উপস্থাপন করাকে সমর্থন করা যাবে না। যে কর্ম বা কথা কোনো প্রাণ বা প্রকৃতির ক্ষতি করে না তা দ্বারা সমাজের লাভ না হলেও অনৈতিক নয়। ফলে এসব ক্ষেত্রে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় না দিয়ে উন্নত বিশ্ব ও তাদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ থেকে ইতিবাচকতা আহরণ করতে হবে। জাবিকে আমি প্রাণের ক্যাম্পাস বলি। ফলে এখানে শুধু মানুষ নয়, বরং সব প্রাণ বা প্রাণীই মুখ্য। এখানে বসবাসরত ও আগত অতিথি পাখিদের জীবন নিয়েও ভাবতে হবে। তাদের জীবন ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
উন্নত করতে হবে হলের খাবার মান। স্বাস্থ্যকর করতে হবে ক্যাফেটেরিয়ার খাবারও।
পা-চালিত রিকশার অতিরিক্ত ভাড়া ও সময়ক্ষেপণ কমানো প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য লিফটসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা আবশ্যক। দেখা যায়, ছুটির দিনে ক্যাম্পাসটি বিনোদন পার্কের অনুরূপ কানায় কানায় মানুষে পূর্ণ ওঠে, ব্যাহত হয় নির্মল প্রকৃতি ও বৈচিত্র্য। এই সমস্যা নিরসনে বহিরাগত প্রবেশ আইন দরকার। যাতে সংশ্লিষ্টজন ছাড়া কেবল অভিভাবক, সাংবাদিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং প্রয়োজনসাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট মানুষই প্রবেশাধিকার পাবেন।
এ ছাড়া সেশনজট থেকে রেহাই এবং গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করা উচিত। প্রত্যাশা করি একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন হবে। আর নির্বাচিত সংসদ উল্লিখিত অধিকার ও দাবি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখবে। এরপর আর নির্বাচনসংক্রান্ত কারণে কোনো আবর্তনের ক্লাস শুরু ও পাঠে বিলম্ব হবে না। কারণ যখন শিক্ষার্থী সংসদের লক্ষ্যই শিক্ষার্থীদের উৎকর্ষ সাধন তখন তাদের দ্বারা কারও কালক্ষেপণ বা অপকারসাধন হলে তা দেশের কাছে খুবই হাস্যকর হয়ে উঠবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ, লালন ও বহন করে অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে ছাত্র প্রতিনিধিদের অগ্রণী অবদান কাম্য। এ ছাড়াও প্রত্যাশা যে, সাহিত্যচর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকা-সহ শিক্ষার্থীদের পূর্ণ বিকাশে শিক্ষার্থী সংসদ জাহাঙ্গীরনগরের গৌরবকে আরও সমুন্নত করবে এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্র কখনোই বাধাগ্রস্ত হবে না। যার মধ্য দিয়ে একতার সঙ্গে অথচ নানা ধর্ম, নানা মত ও বিচিত্র পথে আমরা বিশ্বের কাছে তুলে ধরব আমাদের আবিষ্কার, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
মুহম্মদ রাসেল হাসান
শিক্ষার্থী, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ
৫৪তম আবর্তন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়