ফারইস্ট লাইফে দুর্নীতিবাজদের অপসারণে ৩ সংস্থায় চিঠি

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদে থাকা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার একাধিক আসামিকে কোম্পানি থেকে অপসারণের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) চিঠি দিয়েছেন কোম্পানিটির একজন গ্রাহক। একই চিঠি বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) জাম দিয়েছেন তিনি। গতকাল রবিবার সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

অপসারণের দাবি ওঠা ব্যক্তিরা হলেন কোম্পানির বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোকাদ্দেস হোসেন, পরিচালক মো. মোবারক হোসেন, পরিচালক নাজনীন হোসেন ও নিরপেক্ষ পরিচালক শেখ মোহাম্মদ শোয়েব নাজির।

চিঠিতে দাবি করা হয়, বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। দফায় দফায় পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন হলেও নামে-বেনামে বা আত্মীয়স্বজনের নামে অর্থ আত্মসাৎকারীরাই ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পরিচালনা পর্ষদে থেকে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে অর্থ আত্মসাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে। তবে আসামিদের আত্মীয়স্বজনরাই পরিচালনা পর্ষদে রয়ে গেছেন। ফলে কোম্পানিটির অর্থ আত্মসাতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও অর্থ উদ্ধারে কোনো অগ্রগতি নেই। এতে বীমা গ্রাহকরা চরম হয়রানিতে রয়েছেন। এর থেকে উত্তরণে পরিচালনা পর্ষদে অর্থ আত্মসাৎকারী ব্যক্তি এবং তাদের আত্মীয়স্বজনের অপসারণ করে স্বচ্ছ পরিচালনা পর্ষদ গঠনে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। জানা গেছে, অর্থ আত্মসাতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে চারটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

চিঠিতে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের চার পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলা হয়েছে, মামলার ২ নম্বর আসামি ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক পরিচালক মো. হেলাল মিয়ার ভাই মো. মোবারক হোসেন কোম্পানির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে নিরপেক্ষ পরিচালক হিসেবে আছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি মামলার দুই আসামি মো. হেলাল মিয়ার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আমানত শাহ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মো. মোবারক হোসেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকা অবস্থায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফের গ্রাহকের আমানত বিনিয়োগ করে কমিশনের নামে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে আমানত শাহ সিকিউরিটিজ লিমিটেডে বিনিয়োগ করা অর্থের মাধ্যমে শেয়ার বেচাকেনায় শতকোটি টাকা লোকসান করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

অথচ বীমাকারীর করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা-সংক্রান্ত ৬ দশমিক ৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে ‘রিলেটেড পার্টি ট্রানজেকশন’ অর্থাৎ পরিচালকদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে পূর্ব ঘোষণা দিতে হয়। কিন্তু ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক পরিচালক আলহাজ মো. হেলাল মিয়ার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আমানত শাহ সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে কোনো পূর্ব ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া বীমাকারীর করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের পরিচালনা পর্ষদের আচরণবিধি-সংক্রান্ত ৬ দশমিক ৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে এমন কোনো ব্যক্তি বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারেন না। এই বিধান অনুসারে মো. মোবারক হোসেন মামলার ২ নম্বর আসামি মো. হেলাল মিয়ার ভাই, যা বীমাকারীর করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের পরিচালনা পর্ষদের আচরণবিধির লঙ্ঘন।

অভিযোগকরী মনে করেন, প্রকৃতপক্ষে মো. হেলাল মিয়া কোম্পানির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে না থাকলেও তার প্রক্সি হয়ে উঠেছেন মো. মোবারক হোসেন। ফলে তাকে অপসরণ না করা হলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকা-ে স্বচ্ছতা আসবে না।

চিঠিতে পরিচালক নাজনীন হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, দুদকের মামলার ৪ নম্বর আসামি নাজনীন হোসেন ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন। ফারইস্টের যেসব জমি ক্রয়ের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়, সেই জমি ক্রয়ের কমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন নাজনীন হোসেন।

ফলে নাজনীন হোসেন ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে থাকাও বীমাকারীর করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের পরিচালনা পর্ষদের আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোকাদ্দেস হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, দুদকের করা এই মামলার ৬ নম্বর আসামি মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা. মো. মনোয়ার হোসেন এবং ১১ নম্বর আসামি মোজাম্মেল হোসেন দুজনই ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোকাদ্দেস হোসেনের বড় ভাই।

অথচ বীমাকারীর করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের পরিচালনা পর্ষদের আচরণবিধি-সংক্রান্ত ৬ দশমিক ৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে এমন কোনো ব্যক্তি বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারেন না।

এই বিধান অনুসারে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোকাদ্দেস হোসেন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে থেকে বীমাকারীর করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের পরিচালনা পর্ষদের আচরণবিধির লঙ্ঘন করেছেন।

নিরপেক্ষ পরিচালক শেখ মোহাম্মদ শোয়েব নাজিরের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান পর্ষদের নিরপেক্ষ পরিচালক শেখ মোহাম্মদ শোয়েব নাজির দুদক মামলার ৬ নম্বর আসামি ডা. মো. মনোয়ার হোসেনের ভায়রা ভাই (স্ত্রীর ভগ্নিপতি)। এ হিসেবে শেখ মোহাম্মদ শোয়েব নাজির ডা. মনোয়ার হোসেন এবং ডা. মোকাদ্দেসের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।

এ কারণে শেখ মোহাম্মদ শোয়েব নাজিরের ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান পর্ষদে নিরপেক্ষ পরিচালক থাকা বীমাকারীর করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের ৬ দশমিক ৩ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে এই গাইডলাইনের পরিচালনা পর্ষদের আচরণবিধি-সংক্রান্ত ৬ দশমিক ৫ অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন।