পরিবারভিত্তিক ব্যবসা চ্যালেঞ্জের মুখে

বর্তমানে দেশে পরিবারভিত্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। যার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ, সাপ্লাই চেইনে বিঘœ ও বিনিয়োগে অনীহা। এ ছাড়া আছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, শুল্কযুদ্ধ ও দেশে সরকার পরিবর্তনের পর অনিশ্চিত পরিস্থিতির মতো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। পাশাপাশি পারিবারিক দ্বন্দ্ব, নেতৃত্ব হস্তান্তর ও উত্তরাধিকার নিয়ে জটিলতার মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে। তবে দক্ষতার উন্নয়ন ও কৌশল অবলম্বন করে এসব চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণ সম্ভব।

রাজধানীর গুলশানে গতকাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) কার্যালয়ে ‘যেখানে পারিবারিক মূল্যবোধ ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণকে মিলিত করে : টেকসই উত্তরাধিকারের কৌশল’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

এমসিসিআই, সিঙ্গাপুরভিত্তিক আইন সংস্থা রাজাহ অ্যান্ড ট্যান সিঙ্গাপুর এলএলপি ও এএজেড অ্যান্ড পার্টনার্স যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান, পরিচালক আনাস এ খান ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তপন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

পারিবারিক ব্যবসায় উত্তরাধিকার নিয়ে এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, উত্তরাধিকার শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর নয়, এটি কৌশলগত প্রক্রিয়া। সুপরিকল্পিত উত্তরাধিকার ব্যবস্থা পরিবার ও ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখে, স্থিতিশীলতা আনে ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়। কিন্তু উত্তরাধিকার পরিকল্পনাকে প্রায়ই বিলম্বিত করা হয়। কখনো কখনো এড়ানো হয়। ফলে অনেক সময় একটি পরিষ্কার কৌশলের অনুপস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা হয়। এমনকি ব্যবসা বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যায়, যা তৈরি করতে (কয়েক) দশক সময় লেগেছে।

তিনি বলেন, ‘পারিবারিক ব্যবসা আমাদের অর্থনীতিতে যুগ যুগ ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন, প্রজন্মান্তরের মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি আগামী দিনে আমাদের মনে রাখতে হবে, উত্তরাধিকার শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর নয়, এটি কৌশলগতভাবে অত্যাবশ্যক।’

এমসিসিআইয়ের পরিচালক আনিস বলেন, উত্তরাধিকার একটি মানবিক যাত্রা, যেখানে শুধু সম্পদ নয়; স্বপ্ন, সংস্কৃতি ও উদ্দেশ্যও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। উত্তরাধিকারের পরিকল্পনা শুধু সংকটের সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এটি কৌশলগত চিন্তার ভিত্তি হিসেবে পরিণত হতে হবে। দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং পরিবর্তনশীল জনসংখ্যা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার যুগে, স্পষ্টতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্ব হস্তান্তরের ক্ষমতা শুধু একটি পারিবারিক উদ্বেগ নয়, এটি একটি ব্যবসায়িক প্রয়োজনীয়তা।

এম এম ইস্পাহানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ইস্পাহানি বলেন, শেয়ার থাকলেই কেউ নেতৃত্ব পাবেন, এমন ধারণা ভুল। দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সঠিক শিক্ষা থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই উত্তরাধিকার পরিকল্পনা তৈরি করা অপরিহার্য। শুধু বড় ছেলে বা মেয়ে বলে দায়িত্ব দেওয়া ঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে একক মালিকানায় ব্যবসা হলেও পরিবারের পরিধি বাড়লে শুধু আত্মীয়স্বজন দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। তখন পেশাদার ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে।’ সালমান ইস্পাহানি বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরে পেশাদারভাবে পরিচালিত হচ্ছে।’

একই কথা বলেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘শুধু ছেলে বা মেয়ে বলেই কাউকে সিইও বানানো যাবে না। যিনি সবচেয়ে যোগ্য, তাকেই নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়া ও টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পারিবারিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে পরিবারের নিজস্ব মূল্যবোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। পরিবারে বিশেষ নিয়ম ও মানদ-ও প্রজন্মান্তরে চলে আসে।’

তপন চৌধুরী নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে জানান, ব্যবসায় যোগ দেওয়ার পর প্রথমে বাবার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। সেই সময় দেখেছেন, কীভাবে প্রতিষ্ঠান চলতে হয়। একবার তাদের পারিবারিক বন্ধু নৈশভোজে বাসায় এসেছিলেন। খাবারের আগে তিনি হঠাৎ বললেন, ‘আপনার ছেলে এত কাজ করছে, কেন তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বানাচ্ছেন না?’

তপন চৌধুরী বলেন, ‘এটা তার জন্য খুবই বিব্রতকর ছিল। কারণ, আমাদের সংস্কৃতিতে বাবার সামনে এমন প্রস্তাব দেওয়া যায় না। প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যবসায় এ ধরনের দ্বিধা স্বাভাবিক। সেজন্য প্রতিষ্ঠাতা বা চেয়ারম্যানকেই নির্ধারণ করতে হয়, তার অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে।’ কর্মীরাও পরিবারের মতো হয়ে গেছেন বলে মন্তব্য করেন তপন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা দল হিসেবে কাজ করি এবং একে অন্যের অবদানের স্বীকৃতি দিই।’

দুই উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়, পারিবারিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পরিবারের মূল্যবোধ, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত উত্তরাধিকার প্রয়োজন। শুধু সম্পদ বা শেয়ার থাকা যথেষ্ট নয়; যোগ্য নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

সেমিনারে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়িক পরিবেশের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশে কোম্পানি নিবন্ধনে সময় লাগে প্রায় ৩০ দিন, প্রয়োজন বহুমাত্রিক অনুমোদন ও বিদেশি মালিকানায় কড়াকড়ি আছে। বিপরীতে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধন সম্ভব মাত্র ১৪ দিনে, বিদেশি মালিকানায় বাধা নেই ও ১০০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে দ্বৈত কর সনদ বিদ্যমান। এ ছাড়া বাংলাদেশে করপোরেট করের পরিমাণ ২২ শতাংশ, যেখানে সিঙ্গাপুরে ১৭ শতাংশ।