বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক সিএসও (চিফ সিকিউরিটি অফিসার) রাশিদা সুলতানা অবশেষে শাস্তির আওতায় আসলেন। নানা অনিয়ম করার পরও গত ১৬ বছর তার ধারেকাছেও যেতে পারেননি কেউ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাব খাটিয়ে অপকর্ম করলেও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। রাশিদা সুলতানা শেখ হাসিনাকে সবসময় ‘মা’ বলে ডাকতেন। হাসিনাও তাকে ‘কন্যা’ বলে কাছে টানতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাশিদার প্রভাব কিছুটা কমলেও অনিয়ম বন্ধ হয়নি। বাধ্য হয়ে মাস তিনেক আগে বেচিবক তার বিরুদ্ধে গঠন করে তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে পদাবনতি করে গত ২ সেপ্টেম্বর চিঠি ইস্যু করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যন। তিরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি তার বেতনও কর্তন করার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, রাশিদা সুলতানা সিভিল অ্যাভিয়েশনের ট্রেনিং অ্যান্ড সার্টিফিকেশন বিভাগের উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন কয়েক বছর। পটপরিবর্তনের পর তাকে সংযুক্তি করা হয় ঈশ^রদী বিমানবন্দর পাবনায়। তারপরও তার অপকর্ম কমেনি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হচ্ছে সহকারী পরিচালক (এটিএম) ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক সুপ্লব কুমার ঘোষকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল, ধর্মীয় দিক থেকে কটাক্ষ করা এবং শারীরিকভাবে আঘাতের হুমকি। ২০২০-২১ ও ২০২২ সালের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসআর) যথাসময়ে জমা না করার বিষয়ে ব্যাখ্যা তলবের জবাব দেননি। বেবিচকের সাবেক সদস্য (নিরাপত্তা) আবু সালেহ মাহমুদ মান্নাফী কর্মরত থাকার সময় বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাশিদাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মেডিকেল বোর্ডের কাছে উপস্থিত হতে বলা হলেও সেটিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। মোটর পরিবহন চালক কাওসার আলী অ্যাভসেক বিভাগে কর্মরত থাকাবস্থায় তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও অশোভন আচরণ করেন। তাছাড়া সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপকের কাছে ঘুষ দাবি করলে তা না দেওয়ায় তাকে গালাগাল, লাঞ্ছিত করাসহ চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকিসহ বিভিন্ন অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠেছে দুটি সরকারি বাড়ি এবং একাধিক গাড়ি নিজের দখলে রাখেন।
বেবিচক সূত্র জানায়, অপকর্মের অভিযোগ ওঠায় মাস তিনেক আগে তদন্ত কমিটি গঠন করে বেবিচক। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রমাণ হওয়ায় ২ সেপ্টেম্বর সংস্থাটির চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক শাস্তিসংবলিত চিঠি দিয়েছেন রাশিদা সুলতানাকে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, রাশিদা সুলতানার বিরুদ্ধে সদর দপ্তর অ্যাভসেক বিভাগে কর্মরত থাকাকালে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা প্রতিপালন না করাসহ বেশ কিছু অভিযোগের কার্যক্রম ২০২৩ ও ’২৪ সালে প্রক্রিয়াধীন ছিল এবং অভিযোগগুলোর দালিলিক ভিত্তি থাকায় ও ধারাবাহিকভাবে সব অভিযোগ বেবিচকের কর্মপরিসরে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করায়, জনস্বার্থে এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা আনয়নের স্বার্থে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এরূপ ছয়টি অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট সদর দপ্তরে অ্যাভসেক বিভাগে উপস্থিত হয়ে পরদিন ১৫ আগস্ট শোক দিবস পালনে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্দেশনা প্রদান এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করায় উত্তেজনা সৃষ্টি ও অফিসের কর্মপরিবেশ নষ্ট হওয়া সম্পর্কিত অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়।। ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার কাছ থেকে কোনো জবাব না আসা ও উপস্থিত না হওয়ায় পুনরায় ১০ কার্যদিবস সময় প্রদান করে অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী শেষবারের মতো গত ৪ জুন জারি করা হয় এবং তার সংযুক্তিকৃত কর্মস্থল ও স্থায়ী ঠিকানায় রেজিস্টার্ড ডাকযোগে, ইমেইল ও হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়। বর্ধিত সময়ের মধ্যে রাশিদা সুলতানা কর্তৃক তার আত্মপক্ষ সমর্থনে লিখিত বিবৃতি পেশ না করায় কর্তৃপক্ষের কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালায় তদন্তের সিদ্ধান্ত হলে একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগ তদন্তপূর্বক গত ২৮ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিল করেন। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলায় আনা ‘অসদাচরণ’-এর প্রথম চারটি অভিযোগ তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়।
রাশিদার বিষয়ে বেবিচকের এক কর্মকর্তা গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অফিশিয়াল শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ড, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হুমকি প্রদানেরও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনাকে তিনি মা বলে ডাকতেন। হাসিনাও তাকে কন্যা বলতেন। তিনি বিমানবন্দরে ভিভিআইপি নিরাপত্তা পালনের সময়ে এসএসএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ভিআইপি নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করতেন নিয়মিত। এসএসএফ এই বিষয়ে অভিযোগ দিলে বেবিচকের প্রশাসন বিভাগের তদন্তে তা প্রমাণিত হয়। তিনি ফাইল আটকে রেখে একটি এয়ারলাইনসের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মাসোহারা নিয়েছেন। প্রতি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কাছ থেকে নিয়মিত ফলমূল ও অর্থ আদায় করতেন। তাকে সরাসরি বরখাস্ত করা দরকার ছিল। তার অপরাধের তুলনায় শাস্তি কম হয়েছে। শেখ হাসিনার ভয়ে তার বিরদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া যেত না। তাকে ব্যবহার করে অপকর্ম চালাতে কার্পণ্য করতেন না রাশিদা সুলতানা।’