বাগেরহাটে আসন কমেছে, গাজীপুরে বেড়েছে

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ৩০০ আসনের চূড়ান্ত সীমানার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গাজীপুরে একটি আসন বাড়িয়ে ছয়টি করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাগেরহাটে একটি আসন কমিয়ে তিনটি রাখা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদীয় আসনের এই চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের তথ্য জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ।

ইসি সচিব বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ৩০০ সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।’ এর আগে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য একটি বিশেষায়িত কমিটি গঠন করেছিল নির্বাচন কমিশন। ওই কমিটি ৩০০ আসনের মধ্যে ৩৯টি আসনে ক্ষুদ্র পরিবর্তন করে নতুন সীমানার খসড়া প্রকাশ করে। এরপর দাবি-আপত্তি জানানোর জন্য ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। শুনানি চলাকালে হাতাহাতি ও বিক্ষোভের মতো ঘটনাও ঘটেছে। চার দিন ধরে চলা সীমানা-সংক্রান্ত শুনানি শেষে ইসি সচিব জানিয়েছিলেন, সর্বমোট ১ হাজার ৮৯৩টি আপত্তি ও সুপারিশ আবেদন এসেছে। ১০ আগস্ট পর্যন্ত ৩৩টি জেলার ৮৪টি আসন সম্পর্কিত ১ হাজার ১৮৫টি আপত্তি এবং ৭০৮টি পরামর্শ বা সুপারিশ পাওয়া গেছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সীমানা নির্ধারণের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৬ জুলাই ভূগোলবিদ, নগরবিদ, পরিসংখ্যানবিদসহ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ৯ সদস্যের একটি বিশেষায়িত কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এই কমিটি ৬৪টি জেলার ৩০০ আসনের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে।

গত ৩০ জুলাই ইসি জানায়, আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং আদমশুমারিকে গুরুত্ব দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৬৪টি জেলার গড় ভোটার নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৫০০। এই গড়ের ভিত্তিতে আসনগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়।

ওই সময় নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ২০২২ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে কাজ করতে গিয়ে কারিগরি কমিটি দেখেছে, আদমশুমারিতে অসামঞ্জস্য রয়েছে। বর্তমানে ইসির হালনাগাদ ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে ৪ লাখ ২০ হাজার ৫০০ কমবেশি গড়ের ভিত্তিতে কারিগরি কমিটি গ্রেডিং করেছে। কোনো জেলায় ভোটার বেশি, কোনো জেলায় কম তাও পর্যালোচনা করা হয়।

তিনি আরও বলেন, সর্বনিম্ন ভোটার সংখ্যার জেলায় সেখানে আসন সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। এক, দুই বা তিন আসনবিশিষ্ট জেলাগুলোতে আসন বাড়ানো বা কমানোর বিষয়ে বিবেচনা করা হয়নি। আড়াই শতাধিক আসনের বিষয়ে কোনো আপত্তি বা আবেদন না আসায় বিদ্যমান সীমানাই বহাল রাখা হয়েছে।

তিনি জানান, সর্বোচ্চ ভোটার রয়েছে এমন জেলায় একটি আসন বাড়ালেও সেখানে জাতীয় গড়ের চেয়ে ভোটার বেশি থাকে। সবচেয়ে কম ভোটার রয়েছে এমন জেলায় একটি আসন কমালে জাতীয় গড় ভোটারের কাছাকাছি থাকে। সে ক্ষেত্রে কারিগরি কমিটি সবচেয়ে বেশি ভোটারের জেলায় একটি আসন বাড়ানোর এবং সর্বনিম্ন ভোটারের জেলায় একটি আসন কমানোর প্রস্তাব করেছে।

‘নির্বাচন কমিশনসহ কেউ আস্থার জায়গায় নেই’ : নির্বাচন কমিশনসহ কেউ আস্থার জায়গায় নেই মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেন, আমি আপনি আপনারা, সবাই মিলে কেউ কিন্তু আস্থার জায়গায় নেই। আমি আস্থার জায়গায় আছি, এই দাবি করি না। এই যে আস্থার সংকট এটা আমাদের জাতীয় সংকট। ইসির প্রথম কাজ আস্থার সংকট দূর করা।

গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন ভবনে আরএফইডির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এমন মন্তব্য করেন। বৈঠকে অন্যদের মধ্যে ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ও ইসি সচিব আখতার আহমেদ।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নীতিমালা ২০২৫ জারি করে নির্বাচন কমিশন। শুরু থেকে নীতিমালার বেশ কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি তুলেছে রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি (আরএফইডি) নেতারা। সংগঠনের নেতারা বলেছেন, এ ধরনের নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে ইসির উচিত ছিল সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা এবং সবার মতামত নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা তৈরি করা। বিদ্যমান নীতিমালা বহাল থাকলে সাংবাদিকদের অবাধ তথ্যপ্রবাহ বিঘিœত হবে।

নীতিমালার খসড়া নিয়ে সাংবাদিকদের দাবি বিশ্লেষণ করে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আপনাদের প্রস্তাবিত নীতিমালা পর্যালোচনা করে আপনাদের জন্য সহজ হয়, মানুষের জন্য, স্বচ্ছ ও ফেয়ার নির্বাচনের জন্য যা ভালো হয়, সেটা ইনশাআল্লাহ করব। এ বিষয়ে আর কোনো কথা নেই।’

তিনি বলেন, ‘আপনাদের প্রস্তাবিত নীতিমালায় অনেক সুন্দর বিষয় রয়েছে। অতীতে যদি নীতিমালা প্রণয়নে সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বের বিধান থাকত, তবে কমিটি গঠনই ভিন্নভাবে হতো। আপনাদের প্রস্তাব আমরা স্বাগত জানাই। যেহেতু আমাদের সবার উদ্দেশ্য একটাই ভালো নির্বাচন করা। ছোট কাজ হোক বা বড় কাজ, ভালোমন্দ যাই হোক, সেটি আয়নার মতো তুলে ধরার দায়িত্ব আপনাদের, আর আপনারা তা পালন করছেন।’

আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আরও বলেন, ‘আমাদের নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আস্থা পুনরুদ্ধার। সেই আস্থা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রফেশন, প্রতিটি পেশার সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সবাই সবার প্রফেশনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, এই যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা-বিশ্বাস, এটা যেন থাকে। ভালো নির্বাচন করতে পরস্পরকে সহায়তা করতে হবে।’

জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, ‘আমাদের ভুল হতে পারে, কিন্তু নির্বাচনে কোনো ধরনের অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না। আমরা একটা ট্রান্সপারেন্ট ও ফেয়ার ভোট চাই। একটি ট্রান্সপারেন্ট ভোটের জন্য আপনাদের (সংবাদকর্মী) সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। সাংবাদিকদের জন্য সহজ হয়, এমন কিছু করব। যেটা উভয় পক্ষের জন্য, মানুষের জন্য, স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য, ফেয়ার নির্বাচনের জন্য ভালো হবে।’

নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ বলেন, ‘স্বচ্ছ নির্বাচন যদি চান তাহলে, খোলা জায়গায় নির্বাচন করার মানসিকতা তৈরি করেন, সেটাই হবে স্বচ্ছ নির্বাচন। তা না হলে স্বচ্ছ নির্বাচন কখনো হবে না। এত সাংবাদিককে একসঙ্গে ভোটকক্ষে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া যাবে না।’

ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘তথ্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে। দ্রুত নিষ্পত্তি করে একটি গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক অবস্থান আবারও পুনঃস্থাপন করা হবে। আপনারা যেভাবে কভারেজ দিচ্ছেন, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

মতবিনিময় সভায় আরএফইডি সাংবাদিকদের জন্য প্রস্তাবিত নীতিমালা উপস্থাপন এবং তা ইসির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ সময় আরএফইডির সভাপতি কাজী জেবেল বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী ইসির নীতিমালা সংশোধন করতে হবে। অন্যথায় ইসির সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবে।’