ছাত্র আন্দোলন বৈধ জেনেও বিরোধিতা করতে হয়েছে

জুলাই-আগস্টে ব্যাপক হত্যাকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, গত বছরের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন বৈধ ছিল। তবে এটি জেনেও সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এর বিরোধিতা করতে হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে জেরা শেষ করেছেন শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের

নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ জেরা হয়। আদালত এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) দিন ধার্য করেন।

এর আগে গত মঙ্গলবার এ মামলায় জবানবন্দি দেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। জবানবন্দিতে তিনি নিজের দোষ স্বীকার করে বলেন, গত বছর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশদাতা ছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্দেশনায় মারণাস্ত্র ব্যবহারে বেশি উৎসাহী ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তখনকার কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান হিসেবে দায়িত্বপালনরত হারুন অর রশীদ। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সমন্বয়কদের আটকের প্রস্তাব দিয়েছিল প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)। এ বিষয়টি বাস্তবায়ন করেন ডিবির হারুন। আর আন্দোলন দমাতে হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার এবং গুলির সিদ্ধান্তটি ছিল রাজনৈতিক। এ ছাড়া পুলিশে গোপালগঞ্জ বলয় ও নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব, র‌্যাবের অপহরণ, গুম ও নানা নেতিবাচক কর্মকা-ের বিষয়েও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। জুলাই-আগস্টে পুলিশের প্রধান হিসেবে হত্যাকা- ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় স্বীকার করে তিনি শহীদদের পরিবার, আহত ব্যক্তি, দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। গতকাল জবানবন্দির ওপর জেরা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। পুলিশের সাবেক এই প্রধান মামলার ৩৬তম সাক্ষী।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন জবানবন্দিতে বলেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর (আসাদুজ্জামান খান কামাল) রাতে নিয়মিত বৈঠক হতো। আমি আইজিপি থাকার সময়েও হয়েছে। কিন্তু বৈঠকের বিষয়ে আমাকে জানানো হতো না। চেইন অব কমান্ড ব্রেক করেই হতো। এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট আমির হোসেন তাকে প্রশ্ন করেন, এমন পরিস্থিতি, বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের মধ্যেও আপনি পদত্যাগের চেষ্টা করেননি।

জবাবে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘হ্যাঁ, এ ধরনের অনিয়মের পরেও আমি পদত্যাগের চেষ্টা করিনি।’

আইনজীবী বলেন, ‘আপনি সুবিধাভোগী।’

জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি সত্য নয় যে, আমি সুবিধাভোগী।’

আইনজীবী বলেন, ‘র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অপহরণ, গুম ও হত্যার নির্দেশনা আসত প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে। এই তথ্য আপনি কীভাবে পান।’

জবাবে সাবেক আইজিপি বলেন, ‘বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে জেনেছি। আমার সোর্সরা বিশ্বস্ত ছিল।’

আইনজীবী বলেন, ‘র‌্যাবের টিএফআই বা বন্দিশালা ছিল আপনার তৈরি।’

জবাবে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এটি সত্য নয় যে, র‌্যাবের বন্দিশালা আমার তৈরি।’

আইনজীবী বলেন, ‘এত বড় অপরাধ হওয়ার পরও আপনি বিবেকের দংশনে পদত্যাগ করেননি?’

জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধ হওয়ার পরও আমি পদত্যাগ করিনি।’

আইনজীবী বলেন, ‘আপনি অযোগ্য পুলিশ প্রধান ছিলেন।’

জবাবে সাবেক এই আইজিপি বলেন, ‘আমি অযোগ্য পুলিশ প্রধান ছিলাম, এটি সত্য নয়।’

আইনজীবীর এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “স্নাইপার রাইফেল পুলিশে নতুন এসেছে। আমি আইজিপি হওয়ার আগেই এসেছে। এটা প্রথমে ‘সোয়াত’ টিমকে দেওয়া হয়েছিল।”

আইনজীবী প্রশ্ন করেন, ‘এত মানুষ মারা গেল, এখন যে বিবেকের তাড়নার কথা বলছেন, তখন আপনার বিবেকের দংশন হয়নি?’

তবে, আইনজীবীর এমন প্রশ্নে আপত্তি জানান প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম। একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী বলেন, ‘বিবেকের দংশন ঘটনার সময়ও হতে পারে আবার ঘটনার পরেও হতে পারে। এ প্রশ্ন করা যাবে না।’

আইনজীবীর অন্য এক প্রশ্নে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল হেলিকপ্টার, ড্রোন লেথাল উইপন (মারণাস্ত্র) ব্যবহার করার নির্দেশ দেননি, এটা সত্য নয়।’