ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী আবু বাকের মজুমদারকে সমর্থন দিয়ে সরে গেছেন আরেক জিএস প্রার্থী মাহিন সরকার। তিনি ‘স্বতন্ত্র সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের প্রার্থী হয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। তারা দুজনই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির সমন্বয়ক ছিলেন। গতকাল শুক্রবার মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে আবু বাকের মজুমদারের হাত উঁচু করে সমর্থন দেওয়ার কথা জানান মাহিন সরকার। জানা গেছে, তিনি এনসিপিতে ফিরে যেতে পারেন। এই ঘটনাকে ডাকসু নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে মাহিন সরকারের আবু বাকের মজুমদারের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোর ঘটনা ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এর ফলে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও সরব হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মাহিন সরকার সরে দাঁড়ানোয় ডাকসুতে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদকে (বাগছাস) সরাসরি সমর্থন দিয়ে মাঠে অবস্থান জানান দিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি বলে গুঞ্জন উঠেছে। যদিও বেশ কিছুদিন ধরেই এনসিপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে বাগছাসকে সমর্থন জানিয়ে প্রার্থীদের ভোটার নম্বর ও বিভিন্ন অর্জন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে মাহিন সরকার বলেন, ‘আবু বাকের মজুমদার গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসেনানী, আমার স্নেহের ছোট ভাই। সে যদি বিজয়ী হতে পাওে, সেটি আমার বিজয় বলে সূচিত হবে। আমি আমার সমর্থন আবু বাকের মজুমদারের প্রতি ব্যক্ত করছি। আমি আমার শুভাকাক্সক্ষী সব শিক্ষার্থীকে আহ্বান করছি, আবু বাকের মজুমদারকে জিএস পদে নির্বাচিত করুন, গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে সুসংহত করুন।’
বাকের মজুমদার বলেন, ‘মাহিন ভাই গণঅভ্যুত্থানকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আজকেও তিনি তার পূর্ববর্তী কার্যক্রমের ধারা বজায় রেখেছেন। আমি ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ। সবার পরামর্শ ছিলÑ আমরা যেন একত্রে মুভ করি। এ জায়গায় মাহিন ভাই বড় মনের পরিচয় দিয়েছেন।’
মন্ত্রীপাড়ার চাপে মাহিনকে সরানো হয়েছে খালিদ :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী মাহিন সরকারকে মন্ত্রীপাড়ার চাপের মুখে প্যানেল থেকে সরতে হয়েছে, বলে অভিযোগ করেছেন প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী জামালুদ্দীন মুহাম্মদ খালিদ। গতকাল শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
খালিদ বলেন, ‘একসঙ্গে লড়াই করার জন্য আমরা সমন্বিত প্যানেল গঠন করেছিলাম। এই প্যানেল ঘোষণা করার আগেও আমাদের ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলো, মন্ত্রীপাড়ার চাপ এবং দলীয় হস্তক্ষেপে মাহিন সরকারকে সরে দাঁড়াতে হলো।’
তিনি আরও জানান, সমন্বিত প্যানেলে যোগ দেওয়ার কারণে মাহিন সরকারকে এনসিপি বহিষ্কার করে। বহিষ্কারের আগেও তাকে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়। এমনকি এলাকায় তার নেতাকর্মীদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। শুধু মাহিন নয়, আমাদের প্যানেলের আরও প্রার্থীদের ওপর বিভিন্ন জায়গা থেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। কারও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন খালিদ।
গণনা শেষে কেন্দ্রভিত্তিক ফল ঘোষণা চিফ রিটার্নিং অফিসার :
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেছেন, নির্বাচন শেষে ৮টি কেন্দ্রের ভোট গণনা করে কেন্দ্রভিত্তিক ডাকসু ও হল সংসদের ফল ঘোষণা করা হবে। ফলে আনঅফিশিয়ালি শিক্ষার্থী আগেই ফলাফল জানতে পারবে। আমরা সব কেন্দ্র যোগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করব। গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, ভোট গণনায় প্রত্যেক কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা থাকবে। ৮টি কেন্দ্রে ১৬টি ভোট গণনার মেশিন থাকবে। একটা মেশিন ঘণ্টায় গড়ে চার হাজার ভোট গণনা করতে পারবে। এর মধ্যে দুটো ডাবল ক্যাপাসিটির মেশিন থাকবে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে ১০টি ওএমআর স্ক্যান করা হবে, সেগুলোকে আবার হাতে গণনা করা হবে। ফল ঘোষণার নির্দিষ্ট সময় বলা যাচ্ছে নাÑ তবে দ্রুতই ফল ঘোষণা করব।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যে আমরা ভোট প্রদানের একটি টিউটোরিয়াল ভিডিও প্রকাশ করেছি। সেখানে একজন কীভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট পেপার সংগ্রহ করে ভোট প্রদান শেষে ব্যালট বাক্সে ফেলবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন, তারা প্রথম ভোট প্রদান করবেন। তাদের আগ্রহী করতে এবং পুরো ভোটিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে উৎসাহিত করতে আগামী রবিবার দুপুর ১২টায় বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি এবং ইনস্টিটিউটে চারটি সচেতনতামূলক সভা করা হবে।
কোনো প্যানেলের সঙ্গে জোট হবে না আবিদ :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত ‘আবিদ-হামিম-মায়েদ’ প্যানেল অন্য কোনো প্যানেলের সঙ্গে জোটে যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবিদুল ইসলাম। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মুহসীন হলে জুমার নামাজের পর প্রচারণাকালে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
শিবিরকে ঠেকাতে ছাত্রদল, স্বতন্ত্র ও বাম সংগঠনগুলোর জোট হতে পারে বলে ফেসবুকে গুঞ্জন চলছে এমন প্রশ্নের জবাবে আবিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি আসলে কিছুই জানি না। জানার সুযোগও নেই। প্রচারণা করতে গিয়ে এসব জানার সুযোগ হচ্ছে না। তবে এমন কোনো গুঞ্জন শুনে থাকলে তা ভিত্তিহীন। আমাদের প্যানেল কারও সঙ্গে জোট করবে না।’
অভ্যুত্থানের শক্তি একত্রিত হলে অপশক্তি মাথাচাড়া দিতে পারবে না কাদের :
বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের বলেছেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে পক্ষের শক্তি বিভক্তি সুখকর না। এই শক্তি একতাবদ্ধ হলে, কোনো অপশক্তিই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। আমরা এক থাকলে, একসঙ্গে আবার লড়াই করব এবং নতুন বন্দোবস্তের জন্য সুফলভাবে বয়ে আনব সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ডাকসুমুখী করতে এবং ভোটে উৎসাহী করতে যত ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার আপনারা সেটি করুন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে এই ডাকসুকে কার্যকর করুন। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করার আহ্বান জানান।
শিক্ষার্থীদের আকাক্সক্ষাই আমাদের আকাক্সক্ষা সাদিক কায়েম :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী আবু সাদিক কায়েম বলেছেন, শিক্ষার্থীদের আকাক্সক্ষাই আমাদের আকাক্সক্ষা। আমরা নির্বাচিত হলে আবাসন সংকট সমাধানে গুরুত্বারোপ করব। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক সমাধান হিসেবে শিক্ষার্থীদের আবাসন ভাতা দেওয়া হবে। পরে নতুন হল নির্মাণের মাধ্যমে এর স্থায়ী সমাধান করতে হবে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্যসেন হলে প্রচারণাকালে এসব কথা বলেন তিনি।
এ ছাড়া তিনি ক্যান্টিনে খাবারের মান বৃদ্ধি, পুষ্টিবিদের মাধ্যমে মেন্যু নির্ধারণ ও খাবারের দাম নির্ধারণ, স্বাস্থ্য ও মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন, প্রতিটি হলে মেডিকেল সেন্টার স্থাপনের কথা জানান। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীরা যেন নির্দ্বিধায় ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।
১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত হামিম :
ছাত্রদল মনোনীত জিএস প্রার্থী তানভীর বারী হামিম বলেছেন, আমরা ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা দিয়েছি। শিক্ষার্থীরা যদি তাদের ম্যান্ডেট দিয়ে আমাদের নির্বাচিত করে, নির্বাচিত হওয়ার প্রথম ১০০ দিনে আমরা এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। গতকাল শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় শেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়কালে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমরা ইশতেহার নিয়ে কথা বলেছি। এর আগে আমরা শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়ে এই ইশতেহার তৈরি করেছি। আমরা শিক্ষার্থীদের থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।’