চলে গেলেন বদরুদ্দীন উমর

চলে গেলেন লেখক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী ও মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর। গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ৯৪ বছর বয়সী প্রবীণ এই রাজনীতিক দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। শ্বাসকষ্ট ও রক্তচাপের সমস্যার কারণে গত ২২ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি বাসায়ও ফিরেছিলেন। গতকাল তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সকালে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সকাল ১০টা ৫ মিনিটের দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমর ছিলেন আমাদের মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতির সংগ্রামের এক উজ্জ্বল বাতিঘর। ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা, গবেষণা, ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক দর্শনের প্রতি তার অবিচল নিষ্ঠা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী সরকারের পরিবর্তনের জন্য গোড়া থেকেই গণঅভ্যুত্থানের কথা বলেছেন এবং জুলাই আন্দোলনকে উপমহাদেশের একটি অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের স্বীকৃতি দিয়েছেন।’

বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাশীল মানুষদের জন্য তার লেখনী ও জীবনদর্শন এক অনন্য পথনির্দেশ হিসেবে কাজ করবে। শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বদরুদ্দীন উমরের শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। গতকাল পৃথক শোকবার্তায় উপদেষ্টারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল এক শোক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনচেতা, নির্ভীক কণ্ঠস্বরের এই বুদ্ধিজীবীর এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া জনমনে হতাশার সৃষ্টি করেছে। জনগণের সম্মান ও নিদারুণ বেদনাকে মর্মে মর্মে উপলব্ধি এবং সেটিকে প্রতিবাদের ভাষায় মূর্ত করতে পারতেন মরহুম বদরুদ্দীন উমর। কোনো ভীতি বা হুমকি তাকে তার কর্তব্যকর্ম থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। স্বৈরতন্ত্রকে উপেক্ষা করে তিনি তার স্বাধীন মতামত প্রকাশে কখনোই কুণ্ঠিত হননি।’

শোকবার্তায় বদরুদ্দীন উমরের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকাহত পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তারেক রহমান।

বদরুদ্দীন উমর ১৯৩১ সালে ২০ ডিসেম্বর ভারতের বর্ধমানে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবুল হাশিম ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ। ১৯৫০ সালে বদরুদ্দীন উমরের পরিবার ঢাকায় চলে আসেন। এর আগে তিনি বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে এসে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৫ সালে দর্শন শাস্ত্রে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর পড়তে যান যুক্তরাজ্যে। সেখানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলোসফি, পলিটিকস ও ইকোনমিকসে (পিপিই) ডিগ্রি নেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই তিনি দর্শন বিভাগে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং ১৯৫৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষকতা করেন তিনি। তার হাত ধরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা হয়। ষাটের দশকে তার তিনটি বই প্রকাশিত হয়। সাম্প্রদায়িকতা (১৯৬৬), সংস্কৃতির সংকট (১৯৬৭) ও সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা (১৯৬৯) এই বইগুলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৬৮ সালে বদরুদ্দীন উমর শিক্ষকতায় ইস্তফা দিয়ে রাজনীতি ও সার্বক্ষণিক লেখালেখিতে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

২০০৩ সালে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল গড়ে ওঠার পর এর সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন বদরুদ্দীন উমর। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ছিলেন তিনি। একসময় পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতেও ছিলেন তিনি। গত বছর অন্তর্র্বর্তী সরকার স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য বদরুদ্দীন উমরকে মনোনীত করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর যুক্তি হিসেবে তার ভাষ্য ছিল, এর আগেও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা থেকে তাকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে, কিন্তু তিনি এর কোনোটিই গ্রহণ করেননি।