এশিয়া কাপের মোড়কে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ

বিজ্ঞাপনের জগতে ‘সারোগেট ব্র্যান্ডিং’ নামের একটি কৌশল বহুল প্রচলিত। অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় বা বাজির ওয়েবসাইট এই কৌশলটা বেশি অবলম্বন করে, এর মাধ্যমে মূল পণ্যের প্রচার না করে একই নামের বৈধ কোনো পণ্য বা সেবার প্রচার করা হয়। তাতে আইনের লঙ্ঘনও হয় না আবার ভোক্তার কাছে বার্তাটাও পৌঁছে যায়। এশিয়া কাপ যেন ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথেরই ‘সারোগেট সিরিজ’, শিখন্ডির মতো ‘এ’ গ্রুপে ওমান এবং আরব আমিরাত আরও দুটো দল আছে বটে তবে শক্তিমত্তার এতই ফারাক যে বিশাল বড় কোনো বিপর্যয় না হলে দুই বৈরী প্রতিবেশীই উঠবে সুপার ফোর পর্বে। সেখানে ফের দেখা হবে তাদের, এরপর যদি ফাইনালেও দেখা হয় যায় তাহলে বৃহস্পতি তুঙ্গে।

২০০৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে, ১৫ এপ্রিল সুপার এইটে ব্রিজটাউনের ম্যাচে  অনেকেই ভেবেছিলেন ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হবে। বি গ্রুপ থেকে ভারত আর ডি গ্রুপ থেকে পাকিস্তান এমন অঙ্ক কষে যারা টিকিট কাটলেন, বিশেষ করে ইংল্যান্ড এবং উত্তর আমেরিকার প্রবাসীরা, তাদের রীতিমতো মাথায় হাত। বাংলাদেশ হারিয়েছে ভারতকে, আয়ারল্যান্ড পাকিস্তানকে; ফলে সম্ভাব্য ভারত পাকিস্তান দ্বৈরথ হয়ে গেছে বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড! এমন অঘটনের পর আর ঝুঁকি নেয়নি আইসিসি, সব আসরেই ভারত আর পাকিস্তান একই গ্রুপে। তাদের দেখে শিখেছে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলও (এসিসি)। এবারে ৮ দলের আসর, গ্রুপ পর্বে ভারত আর পাকিস্তানের সঙ্গে ওমান আর আরব আমিরাত। আগের আসর ছিল ৬ দলের, সেখানে ভারত পাকিস্তানের গ্রুপে তৃতীয় দল নেপাল, তারও আগের বছর হংকং। অন্যদিকে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা-আফগানিস্তান একই গ্রুপে। আফগানিস্তানের উত্থান এবং শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ দলের ক্রমাবনতির ফলে এখন এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বে মূলত অনিশ্চয়তা একটিই, সুপার ফোরে অন্য গ্রুপ থেকে কোন দল আসছে, বাংলাদেশ না শ্রীলঙ্কা?

ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ যতটা রাজনৈতিক রঙ্গে উত্তপ্ত, ক্রিকেটীয় দ্বৈরথ হিসেবে এখনকার হিসাবে ততটাই পানসে। রোহিত-কোহলি অধ্যায় ফুরিয়ে গেলেও সূর্যকুমার যাদব-হার্দিক পা-িয়াদের ভারতীয় দলের সঙ্গে হাসান নাওয়াজ-আগা সালমানদের পাকিস্তান দলের কোনো তুলনাই চলে না! ইমরান-আকরামদের উত্তরসূরিদের নিয়ে ভারতের বিপক্ষে জয়ের বাজি ধরার লোকের সংখ্যা ক্রমশ বিলুপ্তপ্রায়। আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের কাছেও হারছে পাকিস্তান। অন্যদিকে আইপিএল প্রজন্মের ক্রিকেটারদের নিয়ে ভারত যেন অশ্বমেধের ঘোড়া, আসছে বছর নিজেদের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখতে তৈরি হচ্ছেন অভিষেক শর্মা-তিলক বর্মারা।
 সবশেষ আইপিএলে ১৭৫ স্ট্রাইক রেটে ৬০০’র বেশি রান করেও জাতীয় দলে জায়গা হয়নি শ্রেয়াশ আইয়ারের। বোঝাই যাচ্ছে কতটা শক্তিশালী ভারতের এই দলটা। দুর্বলতা বলতে ম্যাচ অনুশীলনের ঘাটতি। আগস্টে বাংলাদেশ সফরে ৩টি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলার কথা ছিল ভারতের। রাজনৈতিক কারণে সিরিজটি পিছিয়ে গিয়েছে দেড় বছরের মতো। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারির পর ভারত কোনো আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচই খেলেনি। তাই আইপিএলে ভিন্ন ভিন্ন দলের হয়ে ভালো খেললেও জাতীয় দলে একজোট হয়ে খেলার অভিজ্ঞতার একটা ঘাটতি থেকে যেতেই পারে গৌতম গম্ভিরের শিষ্যদের।
 

পাকিস্তানের অবশ্য ম্যাচ অনুশীলনের ঘাটতি নেই। এই বছর এখন পর্যন্ত ১৮ টি-টোয়েন্টি খেলেছে, জিতেছে ১০টি আর হেরেছে ৮টি। পিএসএলের পর থেকে মাইক হেসনকে কোচ করে বাবর-আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ানকে ছাড়াই নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথনকশা খুঁজছে পাকিস্তান। ফখর জামান, সাইম আইউবদের নিয়ে গড়া দলটা বাংলাদেশে হেরেছে টি-টোয়েন্টি সিরিজ, আরব আমিরাতের মাটিতে ত্রিদেশীয় সিরিজেও একটা ম্যাচ হেরেছে আফগানিস্তানের কাছে। বোলাররা প্রায়ই রান বিলাচ্ছেন আরব আমিরাতের মতো দলের বিপক্ষেও। সব মিলিয়ে পাকিস্তান দলের কোনো ‘ফিয়ার ফ্যাক্টর’ অবশিষ্ট নেই।

আরব আমিরাত এবং ওমান, এই দুটো দলকে আসলে বলা যায় ভারত ও পাকিস্তানেরই ‘অভিবাসী’ দল। দুটো দলে যারা খেলেন তাদের বেশিরভাগই হয় ভারতীয় না হয় পাকিস্তানি। নিজ দেশে খেলা শুরু করে একটা সময় জাতীয়তা বদল করে বেছে নিয়েছেন অন্য দেশ। তাদের পক্ষে ভারত বা পাকিস্তানকে হারিয়ে দেওয়াটা হয়তো বাড়াবাড়িই শোনাবে। গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলায় হতে পারে অনেক কিছুই, তবে এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই ভারত বা পাকিস্তানের বিদায়ের মতো অঘটন না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন, সম্প্রচার স্বত্বসহ অনেক কিছুই যে জড়িয়ে ভারত-পাকিস্তানকে দুই থেকে তিনবার মুখোমুখি করানোর সম্ভাবনায়। এখানে ক্রিকেট রূপকথার জায়গা নেই।