সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনী

মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মব সহ্য করা হবে না

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মব সহ্য করা হবে না। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের আগেও যেভাবে আমরা সশ্রদ্ধ সম্মান করেছি, আজও করি এবং ভবিষ্যতেও আমরা সম্মান করব। কোনো মব সৃষ্টি করে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করার সুযোগ নেই।

গতকাল সোমবার দুপুরে সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সেনা সদরের মিলিটারি অপারেশন পরিদপ্তরের কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই। যারা নির্বাচন করছেন তাদের জন্য শুভকামনা। ডাকসু নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে সাইবার জগতে নানা প্রোপাগান্ডা চলছে। আমরা বিষয়গুলো নজর দিচ্ছি।’

কর্নেল মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, গত ২৯ আগস্ট কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনীর সাহায্যের জন্য অনুরোধ করে। সেনাবাহিনী ওই স্থানে পৌঁছানোর পর উত্তেজিত নেতাকর্মীদের নাশকতামূলক কর্মকা- পরিহার করতে বারবার অনুরোধ জানায় এবং পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসে। পরে বিশৃঙ্খলাকারীরা মশাল, লাঠি ও ইটপাটকেল নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করে পুনরায় সহিংসতা শুরু করে। তারা একাধিক স্থানে অগ্নিসংযোগ করে এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে সেনাবাহিনীর পাঁচ এবং পুলিশের ছয়জন সদস্য গুরুতর আহত হন। ওই ঘটনায় সেনাবাহিনীর একটি পিকআপের উইন্ডশিল্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

তিনি আরও বলেন, গত এক মাসে সেনাবাহিনী ৬৫টি অবৈধ অস্ত্র ও ২৯৭ রাউন্ড গোলাবারুদ এবং আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ১২ হাজার ১১৯টি হারানো অস্ত্রের মধ্যে ৯ হাজার ৭৯৪টি অস্ত্র ও ৩ লাখ ৯০ হাজার রাউন্ড হারানো গোলাবারুদের মধ্যে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৩৫৯ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। তাছাড়া বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত এ পর্যন্ত সর্বমোট ১৭ হাজার ৯২৬ এবং গত এক মাসে ১ হাজার ২৯৪ জনকে সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করেছে। চোরাচালান প্রতিরোধে সেনাবাহিনী গত ৩, ৬ ও ২৭ আগস্ট সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকার বিভিন্ন পণ্য জব্দ করে। ২৬ আগস্ট পর্যন্ত মাসব্যাপী রুমা উপজেলার দুর্গম এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়।

শফিকুল ইসলাম বলেন, আপনারা জানেন গত এক বছরের বেশি সময় ধরে আমরা ধৈর্য এবং অত্যন্ত পরিশ্রমের সঙ্গে দেশের সরকার ও জনসাধারণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আইনশৃঙ্খলা উন্নতি করা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সেনাবাহিনীর কাজ নয়। আমাদের যে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়া হয়েছে, তার মাধ্যমে আমরা গ্রেপ্তার, আটক এবং হস্তান্তর করতে পারি। কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় সাজা দিতে পারি না। সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অলরেডি সবাই কাজ করা শুরু করেছি। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা আরও ভালো হবে বলে আশা করছি।

ডাকসু নির্বাচন কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, এটা বন্ধ করতে সেনাবাহিনী কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না এবং আগামীকাল (আজকের) ভোট যেন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, সে ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী কী ভূমিকা রাখবে এমন প্রশ্ন করা হলে শফিকুল ইসলাম বলেন, ডাকসু নির্বাচনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এর আগেও আমরা আইএসপিআরের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বলেছি, ডাকসু নির্বাচনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবুও কিছু স্বার্থান্বেষী মহল প্রোপাগান্ডা করার চেষ্টা করছে, কিন্তু এই প্রোপাগান্ডা করে খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না। এই নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করছে, আমরা সবার মঙ্গল কামনা করি। এই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সুস্থ পরিবেশে গণতন্ত্র চর্চা হোক, আমরা এটাই চাই এবং নির্বাচনের চর্চা হোক, এটাই চাই।

সেনাবাহিনী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির কোনো বার্তা পেয়েছে কি না, প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা নির্বাচন কমিশন থেকে ফরলাম কোনো নির্দেশনা পাইনি। কিন্তু আমাদের মধ্যে একটা প্রস্তুতি অবশ্যই রয়েছে। আমাদের নির্বাচন কমিশন থেকে যে দায়িত্ব দেওয়া হবে, আমরা সে দায়িত্ব পালন করব।

সেনাবাহিনীকে নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত অনেক সেনা কর্মকর্তা প্রচারণা চালাচ্ছে, এ বিষয়টি সেনাবাহিনী কীভাবে দেখছে প্রশ্ন করা হলে কর্নেল শফিকুল বলেন, এ বিষয়টি অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত। আপনারা বুঝতে পেরেছেন কে কী উদ্দেশ্যে এসব প্রোপাগান্ডা ও মিস-ইনফরমেশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিচ্ছে। আপনারা ভালো বোঝেন, আপনাদের দায়িত্ব দিলাম কে কতটুকু বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মবের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। প্রায় ৮০ শতাংশ হারানো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে। অস্ত্র উদ্ধার হলে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে সহযোগিতা করবে।

মবের বিষয়ে তিনি বলেন, মবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এটা বলেছি আমরা। যেখানে যখন মব হয়েছে সেখানে সেনাবাহিনী দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। কয়েকটি জায়গা আমাদের যে বিলম্ব হয়েছে, সেটা সোর্স থেকে তথ্য পেতে বিলম্ব হয়েছে। যেকোনো ঘটনা ঘটার পর সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন হয়। তারপর আমাদের অনুরোধ জানালে এর মধ্যে কিন্তু কিছু কালক্ষেপণ হয়ে গেছে, তারপর আমাদের নিকটস্থ ক্যাম্প থেকে যদি প্যাট্রল পাঠায় তখনো কিছু সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে আসলে যদি কোনো ঘটনা ঘটে যায়, এটার দায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিতে পারে না। এমন একটি উদাহরণ দেখানো যাবে না যে, আমাদের অনুরোধ করেছে আমরা যাইনি বা সেনাবাহিনীর সামনে মব হয়েছে সেনাবাহিনী যায়নি এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমাদের ওপর আস্থা রাখেন, আমরা চেষ্টা করছি সামনের দিনগুলোতে এই ধরনের ঘটনা ইনশাআল্লাহ আরও কমে আসবে।

গুম কমিশন নিয়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান কী এবং গুম কমিশনকে সেনাবাহিনী কীভাবে সহযোগিতা করছে জানতে চাইলে কর্নেল শফিকুল বলেন, গুম কমিশন নিয়ে সেটা আসলে গুজব। কেননা গুম কমিশনের তদন্তের জন্য আমাদের যাদের ডাকা হয়েছে, সবাই গুম কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছে এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। এখনো সহযোগিতা করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করে যাবে।

সীমান্তে আরাকান আর্মির উৎপাত ও চোরাচালানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সীমান্তে যে সংস্থাগুলো কাজ করে তারা এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে। তারা এ বিষয়ে সজাগ ও সোচ্চার আছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এ বিষয়ে পরিস্থিতি অবনতি হলে সবাই সম্মিলিতভাবে ট্যাকেল দেওয়ার চেষ্টা করছে। সাত শতাধিক রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে।

আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঝটিকা মিছিলগুলো বা কোনো অনিষিদ্ধ দলের জন্য এই মিছিলগুলো করার জন্য যদি নিষেধাজ্ঞা থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খতিয়ে দেখবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।