১৫ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দের মামলার ‘অপমৃত্যু’

মামলার দুর্বল তদন্ত, রাষ্ট্রপক্ষের উদাসীনতার কারণে চট্টগ্রামে ১৫ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৯ কেজি স্বর্ণ জব্দের আলোচিত একটি মামলার ‘অপমৃত্যু’ ঘটেছে। মামলার ঘটনাস্থল থেকে সাড়ে ৯ কেজি স্বর্ণসহ ধরা পড়া দুই আসামি ঘটনার সঙ্গে জড়িত মর্মে দায় স্বীকার করে, পৃথকভাবে দুই বিচারকের খাস কামরায় দোষ স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি প্রদান করা সত্ত্বেও তদন্ত শেষে গত বছরের ৭ এপ্রিল ‘তথ্যগত ভুল’ মর্মে আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট (৯ নং তাং ৭/০৪/২০২৪) জমা দেয় তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। 

গত ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ মো. হাসানুল ইসলামের আদালত আলোচিত এ মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট গ্রহণ করেন। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে উক্ত চূড়ান্ত রিপোর্টের বিষয়ে কোনো আপত্তি উত্থাপিত হয়নি বলে আদেশে উল্লেখ করেন আদালত। আদেশে পুলিশ কর্তৃক দুই আসামির হেফাজত থেকে জব্দকৃত রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাখা ৮২০ ভরি ৭ আনা চার রতি স্বর্ণ ২৪ জন মালিকের বরাবরে ফেরত প্রদানের নির্দেশ দেন আদালত। 

জানতে চাইলে মামলার বাদী বর্তমানে নগরের বাকলিয়া থানায় কর্মরত মোবারক হোসেন মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বলেন, ‘বিজ্ঞ আদালতে সেদিন (৪ সেপ্টেম্বর) আমি উপস্থিত ছিলাম। তবে আমাকে কোনো প্রশ্ন করা হয়নি।’ 

আইনজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, আদালতে অপরাধ প্রমাণের উপযুক্ত আলামত ও উপাদান থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষ এবং প্রসিকিউশন শাখার ‘রহস্যজনক’ উদাসীনতার কারণে ধৃত চার আসামি মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পেয়ে গেছেন। প্রায় দেড় বছর ধরে চূড়ান্ত রিপোর্ট তথা তদন্ত প্রতিবেদনটি নথির সামিলে থাকলেও আদালত কেন্দ্রিক একটি চক্রের কারসাজিতে নথিটিতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণের বিষয়ে বহু বার দিন ধার্য করা হলেও প্রায় ঝুলে ছিল। বহুদিন অপেক্ষায় থাকার পর অবশেষে তদন্ত রিপোর্টের বিষয়ে আদেশ প্রচারিত হওয়ার পর রেহায় পেয়েছেন স্বর্ণ চোরাচালানকারিরা।

এই প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের মানবাধিকার আইনজীবী এড. জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থাকা সত্তেও এই মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য নয়। এটা রাষ্ট্রপক্ষের চরম ব্যর্থতা। রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব ছিল আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা। রাষ্ট্রপক্ষে কাদের নীরবতা ও উদাসীনতায় এমনটি ঘটেছে সেটা তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।’  

আরেক আইনজীবীর প্রশ্ন, তদন্ত সংস্থা স্বর্ণ চোরাকারারিদের রেহায় দিয়ে মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছেন প্রায় দেড়বছর আগে। কিন্তু এ সময়ে রাষ্ট্রপক্ষ কেন নারাজি দেয়নি তা বোধগম্য নয়। এক্ষেত্রে অবশ্যই রাষ্ট্রপক্ষের দায় আছে।’ জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১৬ জুন বেলা সোয়া ১১টায় নগরের কর্ণফুলী উপজেলায় পুলিশ চেকপোস্টে যাত্রীবাহী বাস থেকে সাড়ে ৯ কেজি ওজনের স্বর্ণের চালান জব্দ এবং দুই নারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে আসা স্বর্ণের চালান নিয়ে চট্টগ্রাম শহরের দিকে যাচ্ছিলেন ওই চারজন। এর একদিন পর কর্ণফুলী থানায় ওই চারজনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা (নম্বর ৩৮) দায়ের করেন একই থানার শিকলবাহা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ মোবারক হোসেন। 

গ্রেপ্তার হন- বসুন্ধরা ধর ওরফে জুলি, কৃষ্ণ ধর ওরফে গীতা, নয়ন ধর ওরফে নারায়ণ এবং টিপু ধর ওরফে অলক। অভিযুক্তরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। টিপু ধর কক্সবাজারে স্বর্ণের কারিগর হিসেবে কাজ করেন। ২০২৩ সালের ৭ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শরীফুল ইসলামের আদালতে নয়ন ধর এবং মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. অলী উল্লাহর আদালতে টিপু ধর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তারা নগরের হাজারী গলি ও বিপণি বিতানের বিধান ধর ও কৃষ্ণ ধর কর্মকার নামে দুই স্বর্ণ ব্যবসায়ীর নামও উল্লেখ করেন।

জবানবন্দিতে ২ আসামি আরও জানান, কক্সবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী বাপ্পু ধর এই সিন্ডিকেটের সদস্য এবং টিপু ধর তার দোকানেই চাকরি করেন। চার সদস্যকে কক্সবাজার আসতে এবং স্বর্ণের চালান নিয়ে যেতে বলেছিলেন বাপ্পু। তার নির্দেশনা অনুযায়ী চারজন কক্সবাজারে গিয়ে চালানটি গ্রহণ করেন। পরে তারা কৃষ্ণ ও বিধানের কাছে চালান হস্তান্তর জন্য বাসে করে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। চালানের জন্য বাহকদের নগদ ১৫-২০ হাজার টাকা দেওয়া হত। তবে তার আগেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তারা। উদ্ধার করা এসব স্বর্ণের বর্তমান বাজারমূল্য (৯ সেপ্টেম্বর,২০২৫) ১৪ কোটি ৯৭ লাখ ৬৬হাজার ২৯৮ টাকা।

ঘটনার দুই দিন পর ১৮ জুন আসামিদের গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনে কর্ণফুলী থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) উল্লেখ করেন “আটককৃত স্বর্ণের বৈধ কোনো কাগজপত্র আসামিগণ ঘটনার সময় উপস্থাপন করতে পারে নাই। আসামিগণ পরস্পর আত্মীয়। আটককৃত স্বর্ণ তাহারা পরস্পর যোগসাজসে চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে আনিয়া অন্যত্র পাচারের উদ্দেশ্যে বহন করার সময় পুলিশ কর্তৃক ধৃত হয়।” মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন কর্ণফুলী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মেহেদী হাসান। এরপর তদন্ত করেন চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা (বন্দর) শাখার তৎকালীন সাব- ইন্সপেক্টর রবিউল ইসলাম। সবশেষ তদন্ত করেন পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো শাখার পরিদর্শক মোজাম্মেল হক। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ৭ এপ্রিল এই চোরাচালান মামলার ‘তথ্যগত ভুল’ মর্মে আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেন পরিদর্শক মোজাম্মেল হক। 

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে পিবিআই কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক উল্লেখ করে বলেন, “মামলার ১ নং আসামি বসুন্ধরা ধর ওরফে জুলি ও ৩ নং আসামি নয়ন ধর ওরফে নারায়ণ সম্পর্কে স্বামী স্ত্রী। ২ নং আসামি কৃষ্ণা ধর ওরফে গীতা ৪ নং আসামি টিপু ধর ওরফে অলক পরস্পর আত্মীয়। নয়ন ধর ও টিপু ধর দুজনই স্বর্ণালংকারের কারিগর। সন্দেহভাজন আসামি বাপ্পু ধরের কক্সবাজারে আর এ শ্যামা জুয়েলার্সে কাজ করছিল তারা। আসামি বাপ্পু ধরও স্বর্ণের কারিগর। তিনি (বাপ্পু) কক্সবাজারের বিভিন্ন স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও মালিকদের কাছ থেকে পুরাতন তেজাবিসহ গলানো এবং দন্ডে রূপান্তরকৃত) প্রাপ্ত হয়ে তা চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে এসে নতুন ডিজাইন দিয়ে প্রস্তুত করে পুনরায় কক্সবাজারে গিয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও স্বর্ণের মালিকদের কাছে অলংকার হস্তান্তর সংক্রান্ত কাজ করে আসছিল।” 

অভিযোগ আছে, মামলায় আসামিদের ‘রেহায়’ দিতে কক্সবাজার ভিত্তিক সাতজন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর অভিন্ন বক্তব্য রেকর্ড করেন তদন্ত সংস্থা পিবিআই’র কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, দুই আসামির ১৬৪ ধারা জবানবন্দিতে বিধান ধর ও কৃষ্ণ কর্মকারের নাম উঠে এলেও তাদেরকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য জানতে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের পিপি মফিজ উদ্দিন ভুঁইয়া এবং নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) মফিজ উদ্দিনের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তারা রিসিভ করেননি। পরে পরিচয় দিয়ে তাদের হোয়াটঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি তারা।