বিক্ষোভের মুখে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ

নেপালে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মোড় নিয়েছে। কারফিউ উপেক্ষা করে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করছেন তরুণরা। সোমবারের বিক্ষোভে সরকারের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে নিউ বানেশ্বরসহ কাঠমান্ডু উপত্যকার বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভ করেন তারা। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। পদত্যাগ করেছেন দেশটির রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌদেলও।

এছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক এবং কৃষি ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী রামনাথ অধিকারীও দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবাকে অপহরণ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এদিকে, নেপালে প্রাণঘাতী বিক্ষোভের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ক্ষমতাসীন জোটের শরিক নেপালি কংগ্রেস পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ মন্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন। এ সময় কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলে গতকাল সোমবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ১৯ জন তরুণ নিহত হন। এরপর ক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ে। সোমবারেই কাঠমান্ডুর ফেডারেল পার্লামেন্ট ও অন্যান্য স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহতের পাশাপাশি প্রায় পাঁচ শতাধিক বিক্ষোভকারী আহত হন। এরপর দেশ জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় কারফিউ জারি ও বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে বিক্ষোভকারীরা কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসেন। সকালেই আন্দোলনকারীরা ফেডারেল পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, বিক্ষোভকারীরা কাঠমান্ডুতে পার্লামেন্ট চত্বরের একাংশে ঢুকে পড়ে সরকারের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যান। নেপালের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ফেডারেল পার্লামেন্ট ভবনটি এই বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান প্রতীকী স্থানে পরিণত হয়।

প্রধানমন্ত্রী ওলিসহ একাধিক মন্ত্রীর পদত্যাগ

টানা দুই দিন ধরে ‘জেন-জি’র বিক্ষোভ আর সহিংসতার মধ্যে পদত্যাগ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। বিবিসি জানিয়েছে, নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর তার পদত্যাগের খবর নিশ্চিত করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে দুদিন আগে কাঠমান্ডুতে যে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা প্রধানমন্ত্রীর পতন ঘটাল। নেপালি কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে গত বছরের জুলাইয়ে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন কমিউনিস্ট নেতা ওলি। এর আগে ২০১৫-১৬, ২০১৮-২১ ও পরে ২০২১ সালে আরও একবার সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, দৃঢ়চেতা অবস্থান ও জাতীয়তাবাদী নীতির জন্য পরিচিত ওলি স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অস্থিরতা এবং কর্র্তৃত্ববাদী চর্চার অভিযোগ নিয়ে দায়িত্ব ছাড়লেন। যার দরুন দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের পর নেপালেও প্রবল গণবিক্ষোভে সরকার পতনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, পদত্যাগের পর কেপি শর্মা ওলি এখন দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সহায়তা চেয়েছেন প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে মঙ্গলবার জানিয়েছে, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পর কেপি শর্মাকে ক্ষমতা ছাড়তে বলেন সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেল। নেপালি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, চিকিৎসার কথা বলে কেপি শর্মা দুবাইয়ে চলে যেতে পারেন। তার জন্য হিমালয়া এয়ারলাইনসের একটি বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পদত্যাগ করেছেন দেশটির রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌদেলও।

প্রধানমন্ত্রী ওলির আগেই পদত্যাগ করেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক। গত সোমবার সন্ধ্যায় সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। ওই বৈঠক উপস্থিত ছিলেন এমন একজন মন্ত্রী জানান, বিক্ষোভে ১৯ জন নিহত ও চার শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় নৈতিক কারণে রমেশ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এর আগে নেপালের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক গগন থাপা ও বিশ্ব প্রকাশ শর্মা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের সরে দাঁড়ানোর এক দিনের মাথায় এবার পদত্যাগ করেছেন দেশটির কৃষি ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী রামনাথ অধিকারী। কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে জানানো হয়, মঙ্গলবার কৃষিমন্ত্রী রামনাথ অধিকারী তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। নেপালি কংগ্রেসের এই আইনপ্রণেতা পদত্যাগপত্রে বলেন, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও প্রশ্ন করার অধিকারকে স্বীকৃতি না দিয়ে দমন, হত্যা ও বলপ্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে রাষ্ট্র। এটি দেশকে গণতন্ত্রের বদলে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এদিকে, সহিংস বিক্ষোভের মুখে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির পদত্যাগের পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবাকে অপহরণ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে এ ঘটনার বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। আরজু রানা দেউবা নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার স্ত্রী।

কংগ্রেস কার্যালয়সহ মন্ত্রী-রাজনীতিকের বাড়িতে হামলা

নেপালে সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরা মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ও রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌদেলের বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সোমবারের প্রাণহানির পর গতকাল মঙ্গলবার বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বালাকোটে অবস্থিত ব্যক্তিগত বাসভবনের সামনে জড়ো হন। পরে পরিস্থিতি উত্তেজক হয়ে ওঠে এবং বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রপতির বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর চালাচ্ছে এবং আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল এবং শের বাহাদুর দেউবার বাসভবন ও জ্বালানিমন্ত্রী দীপক খাড়কার বাড়িতেও হামলা চালিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। সদ্য পদত্যাগী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের বাসভবনেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। আগুন লাগার সময় লেখক বাড়িতে ছিলেন কি না, তা এখনো জানা যায়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

সহিংস বিক্ষোভের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে নেপাল সরকার। নেপাল মন্ত্রিসভার মুখপাত্র এবং যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী পৃথিবী শুব্বা গুরুং গতকাল ৯ সেপ্টেম্বর সকালে সামাজিক ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন। নেপালের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সোমবার রাতেই জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর জেনারেশন জেডের দাবির প্রতি সাড়া দিতে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত সপ্তাহে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, লিংকডইন, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্সসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম ও বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন নেপাল সরকার।

মন্ত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে সেনাবাহিনী

সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করায় দেশটির সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে করে ভাইজেপাতি থেকে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিচ্ছে। মঙ্গলবার নেপালি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মন্ত্রীদের বাসভবন থেকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিচ্ছে সেনাবাহিনী। মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাড়িতে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে তাদের ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা উল্লেখ করা হয়নি। সেনাবাহিনীর সিনিয়র নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, পার্লামেন্ট ভবন রক্ষার জন্যও সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সামরিক ঘাঁটিতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ত্রিভুবন বিমানবন্দর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ

কাঠমান্ডুতে সরকারবিরোধী সহিংস আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (টিআইএ) পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও মন্ত্রীদের বাসায় আগুন দেওয়ার ঘটনার পাশাপাশি উড়োজাহাজ চলাচলে নিরাপত্তার অভাব দেখা দিয়েছে। তাই পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরটি বন্ধ রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা দিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুসারে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলো বন্ধ থাকবে।

আলোচনায় কাঠমান্ডুর মেয়র

কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের পর নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন এ প্রশ্নে এখন সবার নজর রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র বলেন্দ্র শাহর দিকে। অনলাইন প্রচারকারীরাও তাকেই নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করছেন বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থীসহ ১৯ জন প্রাণ হারালে বিক্ষোভ পরে সহিংসতায় রূপ নেয়। আন্দোলনের ঝাঁজ আরও বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সরকার সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ মূল দাবিতে পরিণত হয়। বিভিন্ন দল এমনকি ওলির মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যও এই দাবিতে সংহতি জানান। র‌্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া বলেন্দ্র শাহও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। এক ফেসবুক পোস্টে কাঠমান্ডুর মেয়র বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন ছাত্র-যুবা বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠ শোনা উচিত। পোস্টে তিনি লেখেন, আমি তাদের (আন্দোলনকারী) ইচ্ছা, লক্ষ্য এবং ভাবনার কথা জানতে চাই। এই আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার না করার জন্য তিনি নেপালের রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানান। সশরীরে হাজির না থাকলেও আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানান বলেন্দ্র।