জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে ভোট গণনার কার্যক্রমে ছিলেন চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতা (৩১)। তবে, অকস্মাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। গতকাল শুক্রবার সকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।
জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতা জাকসু নির্বাচনে প্রীতিলতা হলে পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার মৃত্যুতে গোটা ক্যাম্পাস জুড়ে শোকের আবহ নেমে আসে। নির্বাচনে দায়িত্বরত তার সহকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ভোট গণনার কক্ষের দরজার সামনে হঠাৎ পড়ে যান এই শিক্ষিকা। দ্রুত তাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তৃব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার বিষয়ে চারুকলা বিভাগের সভাপতি শামীম রেজা সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রীতিলতা হলে আমি রিটার্নিং অফিসার ও জান্নাতুল ফেরদৌস পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম। গতকাল (বৃহস্পতিবার) ভোটগ্রহণ শেষে সন্ধ্যা ৬টার পর তিনি (জান্নাতুল) বাসায় চলে যান। পরে সকাল (শুক্রবার) সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার দিকে ভোট গণনার জন্য তিনি পুনরায় সিনেট ভবনে আসেন। এরপর তৃতীয়তলায় ভোট গণনার কক্ষের দরজার সামনে হঠাৎ পড়ে যান। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাতে সবাই ক্লান্ত হওয়ায় ও পোলিং এজেন্ট না থাকায় একসঙ্গে সব হল সংসদের গণনা শেষ করা যায়নি। জান্নাতুল অন্যান্য সহকর্মীসহ ভোট গণনাকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। সিনেট হলের দরজার সামনে এসেই তিনি পড়ে যান। তার মৃত্যুর ঘটনায় আমাদের মধ্যে শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে।’
এদিকে জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতার মৃত্যুর খবরে সকালে ভোট গণনার কক্ষে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। নির্বাচনী কাজে দায়িত্বরত অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। গতকাল দুপুর ২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে শিক্ষিকা জান্নাতুলকে শেষবারের মতো দেখতে সেখানে আসেন তার সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা।
জাকসু নির্বাচন কমিশনের অব্যবস্থাপনার জন্য শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যু হয়েছে উল্লেখ করে এর সঠিক বিচার দাবি করেছেন জাবির ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সুলতানা আক্তার। তিনি জাকসু নির্বাচনে নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল কেন্দ্রের রিটার্নিং কর্মকর্তা। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন তিনি। সুলতানা আক্তার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এ অব্যবস্থাপনার জন্য দায় নিতে হবে। একই সঙ্গে জান্নাতুল ফেরদৌসের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হল সংসদে একটিমাত্র ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট হচ্ছে, কিন্তু জাকসুতে তিনটা করে, অর্থাৎ যদি আট হাজারে ভাট কাস্ট (প্রদত্ত ভোট) হয়ে থাকে, তবে ২৪ হাজার কাউন্ট (গণনা) করতে হবে ম্যানুয়াল (হাতে গোনা) পদ্ধতিতে। তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব, তিন দিনেও তো এটা সম্ভব হবে না। এ পদ্ধতির আমরা পরিবর্তন চাই।’
জামায়াত আমিরের শোক প্রকাশ : জাকসু নির্বাচনে দায়িত্বরত ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ফেসবুকে গতকাল বেলা ১১টায় দেওয়া এক বার্তায় তিনি লেখেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে ক্ষমা করুন এবং জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। তার পরিবার, সহকর্মী, প্রিয়জন ও আপনজনকে আল্লাহতায়ালা ধৈর্য ধরার তাওফিক দান করুন। আমিন।’
এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ফেসবুকে বার্তা দিয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মহান আল্লাহ উনাকে ক্ষমা করুন। জান্নাত নসিব করুন। পরিবার-পরিজন, সহকর্মী, শিক্ষার্থীসহ সবাইকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন।
‘মেশিনে ভোট গণনা হলে ম্যামকে হারাতে হতো না’ : এদিকে জাকসু নির্বাচনে ভোট গণনার সময় শিক্ষিকা জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যুর ঘটনায় হাতে ভোট গণনার (ম্যানুয়ালি) পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন ওই নির্বাচনে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু। জানাজার আগে তিনি বলেন, “তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে এসেও যদি আমরা ‘ম্যানুয়াল’ পদ্ধতিতে পড়ে থাকি, তাহলে সেটি আমাদের জন্য জটিল হয়ে যায়। আমরা দেখেছি নির্বাচনে এত বেশিসংখ্যক ভোটারের ভোটগ্রহণের পর ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভোট গণনাটা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল।” তিনি বলেন, ‘যদি মেশিনের মাধ্যমে ভোট গণনা করা হতো, তাহলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকত না বলে আমরা মনে করি। মেশিনে ভোট গণনা হলে হয়তো ম্যামকেও হারাতে হতো না।’
মেহেদিরঙা হাতে সংসারজীবনে প্রবেশ করা হলো না জাবি শিক্ষিকা জান্নাতুলের
ছয় মাস আগে সহপাঠীর সঙ্গে বিয়ে রেজিস্ট্রি করে রাখা হয় জাকসু নির্বাচনে ভোট গণনা করতে গিয়ে মারা যাওয়া জাবির চারুকলা বিভাগের শিক্ষিকা জান্নাতুল ফেরদৌসের। আগামী ৫ জানুয়ারি বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল তাদের। কিন্তু এর আগেই জাকসু নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে জীবনের ইতি টানলেন তিনি। অপ্রত্যাশিত বিয়োগের কারণে মেহেদিরঙা হাতে সংসারজীবনে প্রবেশ করা হলো না তার। এমন তথ্য জানিয়ে জান্নাতুলের স্বজনরা বলেন, একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা-মা।
জান্নাতুলের বাবা রুমী খন্দকার দৈনিক ইত্তেফাকের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। তিনি পাবনা প্রেস ক্লাবের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। ওই সময়ে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাছরাঙা টেলিভিশনের বর্তমানের উত্তরাঞ্চলীয় ব্যুরো চিফ উৎপল মীর্জা। তিনি বলেন, ‘রুমী ভাই একদম ভেঙে পড়েছেন। জান্নাতুল তাদের একমাত্র ও আদরের সন্তান ছিলেন। ছয় মাস আগে জান্নতুলের বিয়ে ঠিক হয় রেজিস্ট্রি করে রাখা হয়। আগামী ৫ জানুয়ারি বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি আর হলো না। আনুষ্ঠানিকভাবে মেহেদিরঙা হাতে সংসারজীবনে প্রবেশ করা হলো না তার। এসব জানিয়ে জান্নাতুলের বাবা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।’
স্বজনরা জানান, ছোটবেলা থেকেই জান্নাতুল ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। শিক্ষাজীবনের সব ক্ষেত্রেই তার ফল ছিল ঈর্ষণীয়। ২০০৯ সালে পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস ও ২০১১ সালে পাবনা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসিতেও গোল্ডেন এ প্লাস নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এরপর ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় ভর্তি হন। এরপর কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১ সালে চারুকলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষিকা রোখসানা খানম ডেইজি বলেন, ‘জান্নাতুল খুব চুপচাপ ও শান্ত স্বভাবের ছিল। অত্যন্ত মেধাবী ছিল। আকস্মিকভাবে তার মৃত্যুর খবরে আমরাও শোকাহত।’
গতকাল বাদ জুমা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে জান্নাতুলের জানাজা হয়। এরপর রাতে মরদেহ পাবনায় আনার পর বাদ এশা শহরের কাচারিপাড়া মসজিদে জানাজা শেষে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে। জান্নাতুলের মৃত্যুতে পাবনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার, সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি এবিএম ফজলুর রহমানসহ পাবনার সব সাংবাদিক গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।