জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ ৩৩ বছর ধরে ভোটবিহীন ছিল। তিন দশকেরও বেশি সময় পর গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনের ফল পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে তিন দিন। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় পর গতকাল শনিবার সন্ধ্যার দিকে ঘোষণা করা হয় ফল।
জাকসু নির্বাচনে ভিপি (সহসভাপতি) পদে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলের আবদুর রশীদ জিতু। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের প্রার্থী আরিফ উল্লাহ আদিব। অন্যদিকে, জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে নির্বাচিত হয়েছেন শিবির সমর্থিত প্যানেলের মাজহারুল ইসলাম। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের প্রার্থী আবু তৌহিদ মো. সিয়াম।
ফল ঘোষণার আগে গত শুক্রবার ভোট গণনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতার মৃত্যুর ঘটনায়, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। প্রথমে হল সংসদ নির্বাচনের ফল এবং পরে কেন্দ্রীয় সংসদের ফল ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫টি পদে এবং হল সংসদে ১৩টি পদে নির্বাচন হয়।
ফলাফলে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫টি পদের মধ্যে শীর্ষ চারটি পদের তিনটিসহ ২০টি পদে শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। দুটি পদে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী এবং বাকি দুটি পদে দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন।
জাকসু নির্বাচনে কোনো গোলযোগের খবর না পাওয়া গেলেও অনিয়ম, কারচুপি এবং চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া আটটি প্যানেলের মধ্যে ছাত্রদল সমর্থিত পাঁচটি প্যানেলের ভোট বর্জন, ভোট গণনার সময় চারুকলা বিভাগের শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতার মৃত্যু, ভোট গণনা ও ফল ঘোষণায় নজিরবিহীন বিলম্ব এবং ধীর গতি, নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার ও অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার পদত্যাগের মতো নেতিবাচক ঘটনা জাকসু নির্বাচনের শিরোনাম হয়ে ওঠে। তবে ফল ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমরা নির্বাচনে অনিয়ম ও ত্রুটির খবর দেখেছি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনো অনিয়মের প্রমাণ পায়নি।’
গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের নির্ধারিত সময় ছিল। তবে, কিছু কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলে। এরপর ভোট গণনা শুরু হলেও তা শেষ হয় গতকাল বিকেলে। নির্বাচন কমিশন জানায়, একাধিক প্যানেলের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে ওএমআর পদ্ধতির পরিবর্তে ম্যানুয়ালি (হাতে গণনা) ভোট গণনা করতে হয়েছে, যার কারণে এত সময় লেগেছে।
এবার জাকসুতে ভোটার ছিলেন ১১ হাজার ৮৯৭ জন, যার মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭ হাজার ৯৩৪ জন, যা ভোটের প্রায় ৬৭ শতাংশ। ভিপি পদে ৩ হাজার ৩৩৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আবদুর রশীদ জিতু। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আরিফ উল্লাহ আদিব পেয়েছেন ২ হাজার ৩৯২ ভোট। জিএস পদে ৩ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন শিবিরের মাজহারুল ইসলাম। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আবু তৌহিদ মো. সিয়াম পেয়েছেন ১ হাজার ২৩৮ ভোট। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে ২ হাজার ৩৫৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ফেরদৌস আল হাসান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. জিয়াউদ্দিন আয়ান পেয়েছেন ২ হাজার ১৪ ভোট। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে ৩ হাজার ৪০২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মালিহা নামলাহ পেয়েছেন ১ হাজার ৮৩৬ ভোট। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ ও নারী) পদে বিজয়ী দুজনই শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে মো. তানভীর রহমান, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদক পদে হুসনী মোবারক, সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (পুরুষ) পদে মো. তৌহিদ হাসান, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক পদে আহসান লাবীব, সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (নারী) পদে নিগার সুলতানা, তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে মো. রাশেদুল ইসলাম, ক্রীড়া সম্পাদক পদে মো. মাহমুদুল হাসান, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (পুরুষ) পদে মো. মাহাদী হাসান, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী) পদে মো. ফারহানা আক্তার লুবনা, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মোহাম্মদ রায়হান উদ্দিন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মহিবুল্লাহ শেখ, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে মো. জাহিদুল ইসলাম, নাট্য সম্পাদক পদে মো. রুহুল ইসলাম, পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সম্পাদক পদে মো. সাফায়েত মীর, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে আবু উবায়দা উসামা নির্বাচিত হয়েছেন।
এ ছাড়া পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত তিনটি কার্যকরী সদস্য পদে মোহাম্মদ আলী চিশতী, মো. আবু তালহা ও মো. তারিকুল ইসলাম নির্বাচিত হয়েছেন। নারীদের জন্য সংরক্ষিত তিনটি কার্যকরী সদস্য পদে নুসরাত জাহান ইমা, শেখ নাবিলা বিনতে হারুন ও ফাবলিহা জাহান নাজিয়া নির্বাচিত হয়েছেন।
সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক পদে এবং ১ নম্বর কার্যকরী সদস্য পদে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম প্যানেলের দুজন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া, ক্রীড়া সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে দুজন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন।
হল সংসদে ভিপি ও জিএস যারা : মওলানা ভাসানী হলে ভিপি পদে জয়ী হয়েছে আবদুল হাই স্বপন আর জিএস পদে হৃদয় পোদ্দার। আল বেরুনী হলে ভিপি পদে রিফাত আহমেদ শাকিল, জিএস পদে মো. মুত্তাসির অর্পণ জয়ী হয়েছেন।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে ভিপি পদে বুবলি আহমেদ ও জিএস পদে সুমাইয়া খানম বিজয়ী হয়েছেন। আ ফ ম কামালউদ্দিন হলে ভিপি পদে রায়হান কবীর, জিএস পদে আবরার শাহরিয়ার জিতেছেন। মীর মশাররফ হোসেন হলে ভিপি পদে জিতেছেন খালেদ জুবায়ের শাবাব আর জিএস পদে শাহরিয়ার নাজিম রিয়াদ। শহীদ সালাম-বরকত হলে ভিপি পদে মারুফ হোসেন, জিএস পদে মো. মাসুদ রানা মিশু বিজয়ী হয়েছেন। ১০ নম্বর ছাত্র হলে ভিপি পদে মো. আসিফ মিয়া ও জিএস পদে মো. মেহেদি হাসান জয় পেয়েছেন। শহীদ রফিক-জব্বার হলে ভিপি পদে মো. মেহেদী হাসান, জিএস পদে শরিফুল ইসলাম বিজয়ী হয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে জিএস পদে জিতেছেন মো. মাহমুদুল হাসান ইমন। ২১ নম্বর ছাত্র হলে ভিপি পদে ইবনে সিহাব, জিএস পদে ওয়ালী উল্লাহ আল মাহাদী জিতেছেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে ভিপি পদে জিতেছেন মো. রাকিবুল ইসলাম আর জিএস পদে আলী আহম্মদ। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলে ভিপি পদে মো. সিফাতুল্লাহ ও জিএস পদে মাহমুদুল হাসান শাকিব জয়ী হয়েছেন। জাহানারা ইমাম হলে ভিপি পদে মোছা. মাহমুদা খাতুন ও জিএস পদে রিজওয়ানা বুশরা জিতেছেন। প্রীতিলতা হলে ভিপি পদে সুমাইয়া আক্তার মিথি, জিএস পদে ইফফা রহমান জিতেছেন। বেগম খালেদা জিয়া হলে ভিপি পদে জয় পেয়েছেন ফারহানা রহমান রিথী, জিএস পদে ফাতেমাতুজ জোহরা। বেগম সুফিয়া কামাল হলে ভিপি পদে জান্নাতুন নাঈম জেরিন, জিএস পদে রুবিনা জাহান তিথি জিতেছেন। ১৩ নম্বর ছাত্রী হলে ভিপি পদে নাহাদাতুন হাসানা, জিএস পদে মুহসিনা তুবা বিজয়ী হয়েছেন। ১৫ নম্বর ছাত্রী হলে ভিপি পদে শারমিন খাতুন ও জিএস পদে মেহনাজ মোহনা জিতেছেন। রোকেয়া হলে ভিপি পদে তাসনিম খন্দকার ও জিএস পদে শারমিন আক্তার ইমা বিজয়ী হয়েছেন। ফজিলাতুন্নেছা হলে ভিপি পদে ঐশি সরকার আর জিএস পদে ফারজানা তাবাসসুম রুপা জয়লাভ করেছেন। বীরপ্রতীক তারামন বিবি হলে ভিপি পদে ফারজানা আক্তার, জিএস পদে জিতেছেন প্রিয়াংকা কর্মকার প্রিয়া।
পাঁচ প্যানেলের ৬৮ প্রার্থীর ভোট বর্জন : জাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়া আটটি প্যানেলের মধ্যে পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ এবং তিনটি আংশিক প্যানেল ছিল। এর মধ্যে দুটি পূর্ণাঙ্গ এবং তিনটি আংশিক প্যানেল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনের দিন বিকেলে ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করে। পরে ওই দিন সন্ধ্যায় প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের একাংশের ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল, ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের একাংশের জোটভুক্ত পাঁচ সদস্যের (আংশিক) ‘সংশপ্তক’ প্যানেল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (মার্কসবাদী) আরেক অংশের তিন সদস্যের আংশিক প্যানেল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আট সদস্যের (আংশিক) ‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ প্যানেল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি পদে ১৭৮ জন প্রার্থী ছিলেন। এর মধ্যে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ২৫ জন, প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের একাংশের জোটভুক্ত সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেলের ২৫ জন, ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ ও ছাত্রফ্রন্টের একাংশের জোটভুক্ত সংশপ্তক (আংশিক) প্যানেলের ৫ জন, স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ (আংশিক) প্যানেলের ৮ জন এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী) একাংশের আংশিক প্যানেলের তিনজনসহ ৬৮ জন প্রার্থী ভোট বর্জন করেন।
বিপরীতে নির্বাচনে অংশ নেয় ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) সমর্থিত ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ প্যানেল।
শিক্ষার্থীদের স্বার্থে রায় মেনে নিতে হবে : ছাত্রদলের প্রার্থী
শিক্ষার্থীদের স্বার্থে জাকসু নির্বাচনের রায় মেনে নিতে হবে উল্লেখ করে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) প্রার্থী আঞ্জুমান আরা ইকরা। তিনি লিখেছেন, ‘জাকসু নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে সুষ্ঠু ভোটের জন্য আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে দায়বদ্ধ ছিলাম। কিন্তু প্রশাসনের প্রকাশ্য অনিয়ম ও কারচুপির পরও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এই রায় আমাদের মেনে নিতে হবে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল জাকসু নির্বাচনে ভরসার জায়গা থেকে এজিএস হিসেবে মনোনীত করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেওয়ায় আমি চিরকৃতজ্ঞ। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দায়িত্বশীলদের প্রতি আমার অনুরোধ, নিজেদের ভুলগুলো পুনর্বিবেচনা করে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করা। আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি নতুন ক্যাম্পাস বিনির্মাণ করব।’
যা বলছেন ভোট বর্জনকারী প্রার্থীরা : নির্বাচনের দিন সন্ধ্যায় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়া স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদের ভিপি প্রার্থী মো. মাহফুজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে অনেক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ভোট বর্জন করেছিলাম। তবু শিক্ষার্থীরা যেহেতু ভোট দিয়ে জাকসুর প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছে, আমরা তাদের সহযোগিতা করতে সবসময় কাজ করব। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ও অধিকার আদায়ে কাজ করব এবং সব অনিয়মের বিরুদ্ধে কাজ করে যাব।’ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়া সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের একাংশের আংশিক প্যানেলের এজিএস প্রার্থী সজীব আহমেদ বলেন, ‘আমরা অভিযোগগুলো উপস্থাপন করেছিলাম, কিন্তু তার কোনোটিরই সুরাহা না করে এবং সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়েই নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রক্রিয়া মেনে হয়নি। আমরা চাই, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করে পুনরায় নির্বাচন দেওয়া হোক।’
সবার জন্য, সবার হয়ে কাজ করব : ভিপি জিতু
ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে আবদুর রশীদ জিতু বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা আমার ওপর ভরসা রেখে ভোট দিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ, আমি এই ভরসা ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারব। আমি দলমত-নির্বিশেষে সবার জন্য, সবার হয়ে কাজ করব। জাকসু নির্বাচনে যারা ভোট কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন, যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।’
এটাই চূড়ান্ত বিজয় নয় : জিএস মাজহার
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নবনির্বাচিত জিএস মাজহারুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছি, সাম্য ও ন্যায়ের স্বপ্ন দেখছি, সে জায়গায় জাকসু নির্বাচন হয়েছে। আমরা মনে করি, এটাই চূড়ান্ত বিজয় নয়। আমরা তখনই বিজয় অর্জন করব, যেদিন এই জাকসুর দায়িত্ব পালন শেষে পরবর্তী জাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারব।’
পদত্যাগপত্রে যা বললেন ড. রেজওয়ানা : জাকসু নির্বাচন কমিশনের আরেক সদস্য ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা ফল ঘোষণার আগেই গতকাল পদত্যাগ করেন। বেলা ২টার দিকে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি অভিযোগ করেন, ‘এই কাজ (নির্বাচন কমিশন) চলাকালে আমি আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি, ফলে কমিশন কার্যালয় থেকে সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হই। তাই বিগত কয়েক দিনের নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যেমন ব্যালট পেপার, বাজেট চূড়ান্তকরণ ও অমর্ত্য রায়ের ভিপি পদ প্রার্থিতা বাতিল-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমি ওয়াকিবহাল ছিলাম না। এমনকি এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমাকে জানানো হয়নি এবং এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আমাকে অবগত না করে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনিকভাবে একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তথাপি, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সূত্র ধরে শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও নির্বাচনের ভোট গণনার পরবর্তী সময়ে আমি উপস্থিত হই এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে একজন নির্বাচন কমিশন সদস্য হিসেবে যথাসাধ্য আমার কর্তব্য পালনের চেষ্টা করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একটি ভীষণ রকমের দুর্বল প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, অতিমাত্রার রাজনৈতিক সমীকরণ, এমনকি একজন শিক্ষকের অকালপ্রয়াণ, যিনি কোনোভাবে ভোট গণনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগই পাননি, তাকেও নির্বাচনের ভোট গণনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার মিথ্যা অভিযোগ এবং অদৃশ্য চাপ আমাকে এই কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করতে নৈতিকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।’ তিনি বলেন, ‘৩৩ বছরের আকাক্সিক্ষত শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি, জাকসু শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব গঠন অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষার্থে তৎপর না হয়ে কেবল রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য যখন ব্যবহৃত হয়, একজন নিরপেক্ষ শিক্ষক হিসেবে ওই কমিশনে সদস্য পদে বহাল থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
আজ বন্ধ থাকবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আজ রবিবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন-২০২৫ উপলক্ষে ১০, ১১, ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণ প্রস্তুতি, ভোটগ্রহণ ও গণনা কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নিয়েছেন। তারা নিরলসভাবে পরিশ্রম করে এবং নির্ঘুম রাত কাটিয়ে এখন পরিশ্রান্ত। এ ছাড়া, সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই মানসিকভাবে পরিশ্রান্ত। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অফিস, ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে, এ দিন ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম চলমান রাখতে ভর্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলো খোলা থাকবে। সোমবার ক্লাস ও অফিস যথারীতি খোলা থাকবে, তবে পূর্বনির্ধারিত সব চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত থাকবে।