মাত্র ৫ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পে ৩৮০ কিলোমিটার দূরে কম্পন অনুভূত হয়েছে। আর এমন কম্পন যেন কাছেই কোনো এলাকায় ছিল ভূমিকম্পটির উৎপত্তি। গতকাল রবিবার বিকেল ৫টা ১১ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে ৫ দশমিক ৮ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি কাঁপিয়ে দিয়েছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলকে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপাত্ত অনুযায়ী ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার আগারগাঁও থেকে ৩৮০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। ৫ দশমিক ৮ রিখটার স্কেলের সেই ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছে ভারতের আসামের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে দূরে আসাম ভ্যালি ও হিমালয়ের মাঝামাঝি এলাকায়। কিন্তু এর আগে দেশের পূর্বদিকে মিয়ানমার সীমান্তে এর চেয়ে বড়মাত্রার ভূমিকম্প হলেও এত কম্পন অনুভূত হয়নি। এবার কেন হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও বিশিষ্ট ভূমিকম্পবিজ্ঞানী মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারতের আসামের এই এলাকাটি ভূমিকম্পের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই এলাকার ওপর দিয়ে ফল্টলাইন গেছে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ডাউকি ফল্টের ওপরের দিকে এর অবস্থান। মিয়ানমারের সেগিং ফল্ট যেমন ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তেমনি আসামও ঝুঁকিপূর্ণ।’
কিন্তু সেখানে মাত্র ৫ দশমিক ৮ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের কারণে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত এত কম্পন কেন হলো? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার দূরত্ব মাত্র ৩৮০ কিলোমিটার। বিপরীতে মিয়ানমারের সেগিং ফল্ট প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার দূরে। কম দূরত্বের কারণে আসামের ভূমিকম্পে কম্পন বেশি অনুভূত হয়েছে।’
এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে ডাউকি ফল্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি গবেষক ও জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের উপপরিচালক আকতারুল আহসান বলেন, ‘অবশ্যই কম দূরত্বের কারণে বেশি কম্পন অনুভূত হয়েছে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূমিকম্পটি কম গভীরতায় মাত্র ৫ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হয়েছে। মূলত এ কারণেই কম্পন বেশি অনুভূত হয়েছে।’
এত কম গভীরতায় ভূমিকম্পটি হলো কেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভারতের আসামের এই এলাকাটিতে যেসব ফল্ট রয়েছে সেগুলোর গভীরতা কম। এতে কম গভীরতায় শক্তিগুলো জমা থাকে এবং সেখান থেকেই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে।’
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্প নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের ড. মেহেদী আনসারী বলেন, ‘আসামের এই এলাকাটি অবশ্যই দেশের ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে প্রতি বছর ভূমিকম্প হয়ে থাকে। তবে এই এলাকায় বেশিরভাগ ভূমিকম্প রিখটার স্কেল ৫ এর নিচে হয়ে থাকে এবং প্রতি বছর গড়ে একটি ভূমিকম্প ৫ এর ওপরে হয়ে থাকে।’
ড. মেহেদী আনসারীর এ বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করে আকতারুল আহসান বলেন, ‘এই এলাকায় ছোট আকারের ভূমিকম্প প্রায়ই হয়ে থাকে। তবে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার রেকর্ডও রয়েছে। তাই এ এলাকাটি নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।’
তবে ঢাকা পর্যন্ত কম্পনের তীব্রতা বেশি হওয়ার পেছনে ভিন্ন একটি কারণ বলেছেন ড. মেহেদী আনসারী। তিনি বলেন, ‘ঢাকাসহ আমাদের নগরগুলো জলাভূমি ভরাট করে ভবন নির্মাণ করেছি। এতে আমাদের ভবনগুলোর মাটির গঠন কাঠামো দুর্বল। ফলে কম দূরত্বে কোনো ভূমিকম্প হলে এর প্রভাব আমাদের নগরগুলোতে পড়তে পারে। আসামের ভূমিকম্পটি এই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর আগে মিয়ানমারে একটি বড় ভূমিকম্পের কারণে ঢাকায়ও কম্পন অনুভূত হয়েছিল একই কারণে।
এদিকে ভারতের সিসমোলজি বিভাগের রিপোর্টে দেখা যায়, গতকালের ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল মাত্র ৫ কিলোমিটার। এর আগে ২০২১ সালে এই এলাকায় ৬ দশমিক ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়েছিল। সাধারণত বেশিরভাগ ভূমিকম্প মাটির ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার গভীরে হয়ে থাকে। এ ছাড়া এরও অনেক গভীরে হয়ে থাকে। এর আগে গত ৩১ জুলাই মিয়ানমারে উৎপত্তি হওয়া ৪ দশমিক ৯ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি ১২৫ কিলোমিটার গভীরে হয়েছিল।
উল্লেখ্য, সারা বিশ্বে প্রতি বছর দুই হাজার বার ভূমিকম্প হয়। এদের মধ্যে বছরে ১০০ ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে। ছোট-বড় ২৭টি প্লেট নিয়ে গঠিত পৃথিবী প্রতিনিয়ত গতিতে থাকার কারণে প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে।