যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরও কমতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছয় বিনিয়ন ডলারের মতো। এই বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে পারলে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে আরও খানিকটা কমাবে বলে আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানান, ইতিমধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমতে শুরু করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এই অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট।

গতকাল রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডেন লিঞ্চের নেতৃত্বে বাংলাদেশে সফরে আসা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের এসব কথা জানান। বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপ করা বাড়তি ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরও কমিয়ে ১৫ শতাংশ চায় বাংলাদেশ। এ বিষয়ে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত করতে তিন দিনের সফরে গতকাল ঢাকায় এসেছে প্রতিনিধিদলটি। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে পাল্টা শুল্ক ১৫ শতাংশ করার বিষয়ে আলোচনা হয়নি। বাণিজ্য ঘাটতি কমার সঙ্গে সঙ্গে শুল্ক কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছি এবং তারা এতে আশ্বস্ত করেছেন। ইতিমধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমতে শুরু করেছে। কারণ আমরা যে পণ্যগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, সেই পণ্যগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছি। আমাদের যে (যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে) বিমানসহ বিভিন্ন জিনিস কেনার অঙ্গীকার রয়েছে সেগুলোর অগ্রগতি আমরা পর্যালোচনা করেছি।

তিনি বলেন, অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এটি (বাণিজ্য ঘাটতি) সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, বাণিজ্য ঘাটতি কমছে। তাতে আমাদের উভয়েরই অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ছে। যে কয়েকটি পণ্যের ওপর ভিত্তি করে আমরা বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছি, তার একটি হচ্ছে কৃষিপণ্য, অন্যটি জ্বালানিপণ্য। উভয় পণ্যই এখন সাশ্রয়ী মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে পারছি। তাই আমাদের অগ্রগতি হচ্ছে। এর বাইরেও আমরা প্রচেষ্টায় আছি। পর্যালোচনায় আমাদের অগ্রগতি সন্তোষজনক বলেই আমরা মনে করছি।

উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। যদি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পারি আমাদের শুল্কহ্রাসের আরও সম্ভাবনা রয়েছে।’

বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রথমে ৩৭ শতাংশ এবং পরে ৩৫ শতাংশ ‘পাল্টা শুল্ক’ ঘোষণা করে আলোচনার সুযোগ রেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফার আলোচনা শেষে গত ৩১ জুলাই পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। গত ৭ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য পাল্টা শুল্কের হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ কার্যকর করেছে। তবে দেশটির সঙ্গে এখনো চূড়ান্ত কোনো চুক্তি হয়নি। পাল্টা শুল্ক অন্তত ১৫ শতাংশে নামিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি করতেই আলোচনা চলছে বলে এর আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন শেখ বশিরউদ্দীন। এ কারণে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) কাছে সময় চেয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে সাড়া দিয়ে ঢাকা সফরে এসেছে সহকারী ইউএসটিআর ব্রেন্ডেন লিঞ্চের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল। তিনি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন বাণিজ্যনীতি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বশিরউদ্দীন বলেন, আমাদের যে চলমান আলোচনা রয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় তাদের টিমের সঙ্গে বসেছি। আমাদের যে অ্যাগ্রিমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক, কান্ট্রি স্পেসিফিক কমিটমেন্ট এ বিষয়ে যে আলোচনা চলছিল, আমাদের জয়েন্ট ডিক্লারেশনের রেফারেন্সে আলোচনা করেছি আজকে।

তিনি বলেন, আমরা যেটি বলেছি বাণিজ্য ঘাটতি কমার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের শুল্ককে নিম্নমুখী পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। ওনারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। শুল্ক কমার সম্ভাবনা রয়েছে। চুক্তি করার লক্ষ্যে এ আলোচনাগুলো হচ্ছে। যে ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, চুক্তিকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার উদ্দেশেই এ আলোচনাগুলো হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইউএসটিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বাণিজ্যচুক্তির একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। নতুন করে দরকষাকষিতে দুই পক্ষ একমত হলে খসড়ায় সংশোধন এনে তা চূড়ান্ত করা হবে।

এ সময় বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) সঙ্গে আমাদের ছয় বিলিয়নের মতো বাণিজ্য ঘাটতি আছে। আগের বারে আমরা কমিটমেন্ট দিয়েছিলাম যে, আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে গম  ও সয়াবিন কিনি। তাদের দেশও সারা পৃথিবীতে এগুলো বিক্রি করে। তাদের দেশ থেকে এগুলো আনলে আমরা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পারি, কিছু সুবিধা পেতে পারি। আমরা তাদের জানিয়েছি যে কমিটমেন্ট করেছিলাম, সেখানে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে। অগ্রগতি হয়েছে তো, গত অর্থবছরে আমরা ৬০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের তুলা কিনেছি। এ বছর দুই মাসেই ২৭৬ মিলিয়ন হয়েছে, গম কিনেছি। বেড়েছে তো। এগুলোই আমরা তাদের বলেছি।

কবে শুল্ক চুক্তি হবে, সে বিষয়ে প্রতিনিধিদল ফিরে গিয়ে একটা সময় জানাবে বলেও জানান বাণিজ্য সচিব।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরকালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঙ্গেও বৈঠক করবে।