নেপালের বিলুপ্ত পার্লামেন্ট পুনর্বহালের জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে দাবি জানিয়েছে দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। বিবিসি জানিয়েছে, নেপালি কংগ্রেস, সিপিএম-ইউএমএল এবং মাওইস্ট সেন্টারসহ আটটি রাজনৈতিক দল এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল অসাংবিধানিক কাজ করেছেন। নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান সুশীলা কার্কির সুপারিশের ভিত্তিতে শুক্রবার প্রেসিডেন্ট পৌডেল পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। এটি নেপালের তরুণ আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। এদিকে, নেপালে আন্দোলন থেকে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা বৃহত্তর কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন নবনিযুক্ত অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ধ্বংসযজ্ঞে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে। বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ৭২ জনে পৌঁছেছে। বিক্ষোভ-সহিংসতায় পর্যটন খাতে ২৫ বিলিয়ন রুপির ক্ষতি হয়েছে। শুধু হিলটন হোটেলেই ক্ষয়ক্ষতি ৮ বিলিয়ন রুপি। হোটেলে ভাঙচুর-আগুনের কারণে অনেক বুকিং বাতিল হয়ে গেছে। এতে মূল পর্যটন মৌসুম শুরুর ঠিক আগে বড় ধাক্কা খেল দেশটির গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি। নেপালে মোট পর্যটকের এক-তৃতীয়াংশই আসেন এই মৌসুমে। তবে এর মধ্যেও পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা নেপালিদের।
নেপালের প্রথম সারির আটটি রাজনৈতিক দল দেশটির সদ্য বিলুপ্ত পার্লামেন্ট পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, প্রেসিডেন্টের পার্লামেন্ট বিলুপ্ত ঘোষণা অসাংবিধানিক। এটা করার এখতিয়ার তার নেই। তা করতে হলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই তা করতে হবে। গত শনিবার এক যৌথ বিবৃতিতে দলগুলো এই দাবি জানায়। এতে নেপাল কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল, মাওইস্ট সেন্টারসহ মোট আটটি দলের প্রধান হুইপ সই করে। পার্লামেন্ট বিলুপ্ত ঘোষণা বিক্ষোভকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তারা আরও বলেছে, আগামী বছরের ৫ মার্চের ঘোষিত নতুন নির্বাচনসহ আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট পৌডেল বলেন, অনেক কঠিন এবং ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধান অর্জিত হচ্ছে। সংবিধান সচল আছে, পার্লামেন্টারি পদ্ধতি সচল আছে এবং ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এখনো বহাল আছে। ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জনগণের আরও কার্যকর গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।
এদিকে, নেপালে আন্দোলন থেকে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার পেছনে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন নবনিযুক্ত অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ধ্বংসযজ্ঞে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে। রবিবার সিংহ দরবারে নিজের নতুন কার্যালয়ের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে নেওয়ার সময় জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী কার্কি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে পরিস্থিতিতে গঠিত হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা সবাই অবগত আছি। গত কয়েক দিনে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য-আলামত ধ্বংস করা হয়েছে। সরকারি বাহন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে হামলা চালানো হয়েছে। এসব ঘটনার অবশ্যই বিচার করা হবে এবং দোষীদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা হবে। পরিস্থিতির ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে মুখ্য সচিব একনারায়ণ আচার্য বলেন, সরকারি কার্যালয় ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি দ্রুত পুনর্গঠন তহবিল বরাদ্দ ও জরুরি সেবা পুনঃস্থাপনের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ৭২ জনে পৌঁছেছে বলেও জানান তিনি। দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৯১ জন ব্যক্তি চিকিৎসাধীন রয়েছে।
২,৫০০ কোটি রুপির ক্ষতি : গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে বিক্ষোভ-সহিংসতায় উত্তাল হয়ে ওঠা হিমালয়ের দেশ নেপালে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, সহিংসতা চলে বিভিন্ন জায়গায়। দুই দিন ধরে চলা বিক্ষোভে দেশটির পর্যটন খাত প্রায় ২৫ বিলিয়ন (২ হাজার ৫০০ কোটি) রুপির ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিক্ষোভে হোটেলে ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে, ব্যাহত হয়েছে ভ্রমণ। পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই ব্যাপক হারে হোটেলগুলোর বুকিং বাতিল হয়েছে। হোটেল অ্যাসোসিয়েশন নেপালের প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুই ডজনের বেশি হোটেল ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু কাঠমান্ডুর হিলটন হোটেলেই ৮০০ কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে। পোখারা, ভৈরহাওয়া, বিরাটনগর, ধনগাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের স্থাপনা পোড়ানোর ছবি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও বড় ধাক্কার কারণ হতে পারে। এর আগে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল দেশটির পর্যটন। ২০১৫ সালের ভূমিকম্প এবং করোনা মহামারীর সেই সংকট কাটিয়ে উঠেছিল নেপাল। সেই অভিজ্ঞতায় এবারও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা পর্যটন ব্যবসায়ীদের। নেপালের জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ৬.৭ শতাংশ। বর্তমানে সেখানে অবস্থান করছে প্রায় ১৫ হাজার পর্যটক। নতুন করে লোকসান ঠেকাতে তাদের নিরাপত্তাসহ বিশ্বে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরাই এখন দেশটির সামনে চ্যালেঞ্জ।