সরকারকে বিভ্রান্ত করে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনকে বাধাগ্রস্ত, সরকারের নীতিতে হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে প্রভাবিত করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গবেষণা প্রকাশ করছে ইনসাইট ম্যাট্রিকস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ইনসাইট ম্যাট্রিকসের ওয়েবসাইট বিশ্লেষণ করে দেখা যায় তারা বহুজাতিক তামাক কোম্পানির হয়ে কাজ করে। বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে তারা তামাক কোম্পানির ব্যবস্থাপত্র অনুসারে তৈরি এই গবেষণা প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাস্তবতা-বিবর্জিত উপাত্ত প্রচার করছে। এ বিষয়ে এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে তামাক করবিষয়ক নলেজহাব বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি)। গতকাল সোমবার প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়।
বিএনটিটিপি জানায়, চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি এনবিআর সিগারেটের সব স্তরের মূল্য ও করহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে। অন্যসব মহলে এটি ব্যাপক প্রশংসিত হলেও তামাক কোম্পানিগুলো এনবিআরের এই উদ্যোগকে বিতর্কিত করতে রাজস্ব ক্ষতি, চোরাচালান বৃদ্ধি ও অবৈধ সিগারেট বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। এই গবেষণা সরকারকে বিভ্রান্ত করতে তামাক কোম্পানির ঘৃণ্য প্রোপাগান্ডার অংশ। পাশাপাশি কথিত গবেষণার সূত্র ধরে সম্প্রতি কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিভ্রান্তির অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। দেশ ও জনগণের কল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলা ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ গণমাধ্যমকে এমন সংবাদ প্রচারে আরও সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছে বিএনটিটিপি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কথিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুচরা বিক্রেতাদের প্রায় ৮২ শতাংশ অবৈধ সিগারেটের নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাচ্ছেন। বিষয়টি অত্যন্ত হাস্যকর। কারণ এসব বিক্রেতা বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো কর্তৃক নিবন্ধিত এবং সরাসরি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। তারা কোন সিগারেট বিক্রি করবে, তা তামাক কোম্পানিগুলোই নির্ধারণ করে দেয়। এ ছাড়া বিএনটিটিপির নিয়মিত সিগারেটের বাজার মনিটরিংয়ের অভিজ্ঞতা এই তথ্যকে সমর্থন করে না।
বিএনটিটিপি জানায়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই গবেষণায় দেশে অবৈধ তামাকের বাজার ৩১ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ভুয়া, পুনর্ব্যবহৃত কিংবা সম্পূর্ণ ট্যাক্স স্ট্যাম্পবিহীন সিগারেট বাজারে সয়লাব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অথচ এনবিআরের আটক করা শীর্ষ ১০ পণ্যের তালিকায় সিগারেট নেই। এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আর্ক ফাউন্ডেশন’ পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, বাজারে মোট অবৈধ সিগারেট মাত্র ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর মধ্যে অবৈধ ট্যাক্স স্ট্যাম্প ব্যবহার করেছে এমন সিগারেট মাত্র ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। সুতরাং দেশের বিশাল সিগারেটের বাজারের খুব সামান্য অংশ অবৈধ এবং এই অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিই জড়িত বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর গবেষণায় দেখা গেছে, এমআরপির চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করে বছরে প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয় তামাক কোম্পানি।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার নানা উদ্যোগ নিয়ে চলেছে। এসব কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে অসৎ উদ্দেশ্যে তামাক কোম্পানিগুলো এমন মিথ্যাচার ও অপপ্রচার করছে। অথচ তারাই প্রতিবছর নানা কৌশলে বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ৯ জানুয়ারি সরকার অন্তর্বর্তী সিগারেটের মূল্য ও করহার বৃদ্ধির পর বিএনটিটিপি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল, তামাক কোম্পানিগুলো চোরাচালান বৃদ্ধি এবং দেশে অবৈধ সিগারেটের উৎপাদন বৃদ্ধিতত্ত্ব হাজির করবে, যা বর্তমানে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, বিশ্বে যেসব দেশে সিগারেটের দাম সবচেয়ে কম, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের সিগারেটের দাম বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। তাই বেশি দামের দেশ থেকে কম দামের দেশে সিগারেট চোরাচালান হয়ে আসবে এই যুক্তি টেকে না। বিইআর ও বিএনটিটিপির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের প্রায় সব খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে বড় তামাক কোম্পানিগুলোর নিয়মিত সংযোগ রয়েছে। ফলে সব বিক্রয়কেন্দ্রে তাদের নজরদারি ও পর্যবেক্ষণে থাকায় নকল সিগারেট বিক্রির প্রোপাগান্ডা গ্রহণযোগ্য নয়।