আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আসন সীমানার পুনর্নির্ধারণের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন বা ইসি। তবে সংসদীয় আসনের সীমানার চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর বিক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বাগেরহাট, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি জায়গায় হরতাল, বিক্ষোভ, হামলা-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। সবশেষে গতকাল সোমবার নতুন করে বিক্ষোভ-সহিংসতা হয়েছে ফরিদপুরের ভাঙ্গায়। গতকাল দুপুরের দিকে সেখানে বিক্ষুব্ধ মানুষ থানা ও উপজেলা পরিষদে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এতে করে ভাঙ্গা হয়ে দক্ষিণের ২১ জেলার সঙ্গে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিকেলের দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এদিকে ফরিদপুর-৪ সংসদীয় আসন পুনর্নির্ধারণ করে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। গতকাল বিকেলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মো. জহিরুল হক শাহজাদা মিয়া এবং জিয়া শিশু-কিশোর সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহ আলম রেজাসহ ১৬ জন এটি দায়ের করেছেন। রিটকারীদের পক্ষে আবেদনটি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, রিটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিবকে বিবাদী করা হয়েছে।
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, ফরিদপুর-৪ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস ও গত রবিবার রাতে পুলিশের করা মামলার প্রতিবাদে ভাঙ্গা উপজেলার গোলচত্বর এবং আশপাশের এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সকাল থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও এরপর ধীরে ধীরে অবরোধকারীরা জড়ো হতে শুরু করে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা দুপুর ১২টার দিকে ভাঙ্গা উপজেলার আলগি ও হামিরদী ইউনিয়ন ছাড়াও অন্য দশটি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার বাসিন্দারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়ে উপজেলা পরিষদ ও ভাঙ্গা ট্রাফিক কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। এরপর বিক্ষোভকারীরা ভাঙ্গা গোলচত্বর ইন্টারচেঞ্জের পাশে অবস্থিত ভাঙ্গা হাইওয়ে থানায় ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ সময় অবরোধকারীরা সহিংস রূপ নেয়। হামলা ও ভাঙচুরের সময় ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় সাংবাদিকরা তাদের দায়িত্ব পালন করতে গেলে তাদেরও বাধা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হন।
হামলাকারীরা হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশ কার্যালয়ের চারটি গাড়ি ভাঙচুর করে। এ ছাড়া ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার একটি রেকার, একটি জলকামান, পাঁচটি প্যাট্রল ডিউটি কার, একটি পাজেরো জিপ, একটি অ্যাম্বুলেন্স এবং আটটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এ সময় ভাঙ্গা হাইওয়ে থানা-পুলিশের কাছে থাকা বেশ কয়েকটি আলামতের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া উপজেলা পরিষদে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয় এবং বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। বিক্ষোভকারীদের তাণ্ডব থামাতে পুলিশের একটি দল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে গেলে তারা জনতার ধাওয়ার মুখে পড়ে এবং পাশের মডেল মসজিদে আশ্রয় নেয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ সময় ভাঙ্গা থানা ঘেরাওসহ পুলিশের একাধিক গাড়ি ভাঙচুর ও একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এপিবিএনকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।
আলগি ও হামিরদী ইউনিয়ন ছাড়াও ভাঙ্গার অন্য ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বাসিন্দারা একযোগে সমর্থন জানিয়ে এ সময় জড়ো হয়। তারা জানিয়েছেন, তাদের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এর আগে ভোর থেকে অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু দুপুর ১২টার আগে থেকে তারা আবার সড়ক অবরোধ শুরু করে। পরে দুপুর ১টার পর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে একযোগে সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। এ সময় ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের বাধা দিলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হাইওয়ে পুলিশের ওসি মোহাম্মদ রকিবুজ্জামান জানান, ভাঙ্গা থানা ঘেরাওসহ একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে বিক্ষোভকারীরা। এ ছাড়া ইউএনও ও নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং সেখানে থাকা কয়েকটি গাড়ি ও আটটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান জানান, তারা কার্যালয় থেকে নিরাপদ স্থানে রয়েছেন। কারও ওপর হামলার ঘটনা ঘটেনি। তবে ইউএনও কার্যালয়ের কিছু অংশ ভাঙচুর করা হয়েছে। নির্বাচন কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে আন্দোলনকারীরা।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. কামরুল হাসান মোল্লা বলেন, ‘আমরা বিক্ষুব্ধদের শান্ত করার চেষ্টা করছি। আসন পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। আমরা দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিলে আশা করি, দু-এক দিনের মধ্যে এর সমাধান হবে।’
বিকেল সাড়ে ৩টার পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এ সময় মহাসড়কে স্বল্প পরিসরে যান চলাচল শুরু হয়।
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসন পুনর্বহালের দাবিতে সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটির ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালে জেলার ১৬টি অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার সড়কে যান চলাচল থাকে গতকাল। এতে শত শত বাস শ্রমিকের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। শ্রমিকরা সরকারের কাছে দ্রুত দাবি মেনে নিয়ে এই অচলাবস্থার সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
বাগেরহাট আন্তঃজেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জেলার ১৬টি রুটে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। গত আগস্টের শেষ থেকে দফায় দফায় হরতালে পরিবহন ব্যবসায় জড়িত সহস্রাধিক মানুষের আয় বন্ধ। শ্রমিক ও মালিকদের জীবন অচল হয়ে পড়েছে।’
সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটির সদস্য জামায়াত নেতা মঞ্জুরুল হক রাহাদ বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করছি। সরকার এখনো আমাদের দাবি মেনে নেয়নি। আসন ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, হরতালে সড়ক-মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকলেও হাট-বাজার ও ছোট যানবাহন চলাচল করছে। পিকেটারদের বিশৃঙ্খলা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে।
হরতাল প্রত্যাহারের ঘোষণা : গতকাল বিকেলে সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটির কো-কনভেনর ও জেলা বিএনপির সমন্বয়ক এমএ সালাম জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবের দুর্ভোগ কমাতে মঙ্গল ও বুধবারের আধাবেলা হরতাল প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে এই দুদিন জেলার সব উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে।