বদলে যাচ্ছে পরিসংখ্যান ব্যুরো

আমূল বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে বিভিন্ন উন্নত দেশের আদলে এর নামকরণ হবে ‘পরিসংখ্যান বাংলাদেশ’ বা স্ট্যাটিস্টিকস বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সংস্থার প্রধানের পদ-পদবিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রধানের পদবি হবে প্রধান পরিসংখ্যানবিদ বা চিফ স্ট্যাটিস্টিশিয়ান। বর্তমানে এ পদের নাম মহাপরিচালক। একটি কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে এই প্রধান নিয়োগ করা হবে। সারা বছরের কাজকর্মও দেখভাল করবে এ কাউন্সিল। কাউন্সিলের নেতৃত্ব দেবেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা।

গতকাল সোমবার পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের কাছে খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করে বিবিএস সংস্কারে গঠিত টাস্কফোর্স। এরপর এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন টাস্কফোর্সের প্রধান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। এ সময় টাস্কফোর্সের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

খসড়া প্রতিবেদনে কী ধরনের সুপারিশ করা হয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাত সদস্যের কাউন্সিল গঠন করা হবে, যার নাম হবে ‘ট্রাস্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি কাউন্সিল অব স্ট্যাটিস্টিকস’। এই কাউন্সিল প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান করবে, বার্ষিক কর্মক্ষমতা ও ব্যয় নিরীক্ষা পর্যালোচনা করবে এবং প্রধান পরিসংখ্যানবিদ নিয়োগ প্রক্রিয়া তদারকি করবে।

টাস্কফোর্স সুপারিশ করেছে, ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান আইন সংশোধন করে পরিসংখ্যান বাংলাদেশকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। তথ্য যাচাই-বাছাই ও প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব যাতে না পড়ে, সে বিষয়ে আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে আটটি উইং থেকে ১৬টি উইংয়ে সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে ৪৩৭টি নতুন পদ সৃষ্টি করে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ জোরদারের কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘদিনের ক্যাডার ও নন-ক্যাডার দ্বন্দ্ব নিরসনে এনক্যাডারমেন্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি একক ও পেশাদার ক্যারিয়ার কাঠামো তৈরি করার সুপারিশও এসেছে।

আর্থিক দিক থেকে প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করতে বাজেটীয় স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়েছে। নিয়মিত জরিপ পরিচালনার জন্য স্থায়ী রাজস্ব তহবিল গঠন এবং জরুরি ভিত্তিতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সাধারণ জনগণের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান। বাজারদরের সঙ্গে সরকারি হিসাবের ফারাক নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকায় রিপোর্টে বলা হয়েছে, তথ্য সংগ্রহের উৎস, কোন কোন বাজার থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে, কোন কোন পণ্য অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে এবং কীভাবে মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করা হচ্ছে এসব বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। প্রাক-ঘোষিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সব ব্যবহারকারীর জন্য একই সঙ্গে তথ্য প্রকাশ, পদ্ধতিগত নোট ও সম্পূর্ণ মেটাডেটা প্রকাশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে জনসম্পৃক্ততার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রতিবছর একটি বার্ষিক পরিসংখ্যান সম্মেলনের প্রস্তাব এসেছে, যেখানে নীতিনির্ধারক, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিসংখ্যানবিদরা মতবিনিময় করবেন। বড় জরিপের জন্য পরামর্শক কমিটি গঠন এবং তরুণ গবেষকদের জন্য ইন্টার্নশিপ সুযোগ তৈরির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি আধুনিক প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে উন্নীত করে পূর্ণাঙ্গ একাডেমি করা হবে, যেখানে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত, মধ্যম স্তরের কর্মকর্তা এবং উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপকদের জন্য কাঠামোবদ্ধ পাঠক্রম থাকবে। পাশাপাশি একটি ‘পদ্ধতিগত পরামর্শক কাউন্সিল’ গঠন করে জরিপগুলোয় মান ও সামঞ্জস্য বজায় রাখার সুপারিশও করা হয়েছে।

প্রতিবেদন গ্রহণের পর পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘একটি দেশের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অপরিহার্য। পরিসংখ্যান যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, নীতি প্রণয়ন দুর্বল হয়ে পড়ে। এই রিপোর্টের প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে আমাদের পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। অভ্যন্তরীণভাবে আস্থা বাড়বে, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের পরিসংখ্যান গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে সভা শেষে টাস্কফোর্সের প্রধান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বিবিএসের নাম পরিবর্তন এবং সংস্থার প্রধানের পদ-পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছেন তারা। একটি পরিসংখ্যান কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে এই পদে যোগ্য ব্যক্তি খুঁজে নিয়োগ দেওয়া হবে। এর প্রধান হবেন চিফ স্ট্যাটিস্টিয়ান।’

স্বাধীন কমিশন হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের একমাত্রিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া চ্যালেঞ্জিং। এটি আমাদের কাজের সূত্রপাতের অংশ ছিল না। সাহসী, সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত সংস্কার প্যাকেজ এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জমা দিয়েছি।’

হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, ‘টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে বাংলাদেশের পরিসংখ্যানকে গুণগত পর্যায়ে এবং স্বচ্ছতার পর্যায়ে দৃশ্যমান করার জন্য। এজন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো নিশ্চিত করা দরকার, সেগুলো কীভাবে সুনির্দিষ্টভাবে বিন্যাস করা যায়, সেগুলো তুলে ধরেছি।’

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানকে প্রধান করে গঠিত টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে আছেন বিবিএসের প্রাক্তন মহাপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াজেদ, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইএসআরটি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাত হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আতনু রব্বানী এবং বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস।