বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) চেয়েও বেশি কর্মসূচি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ইশতেহার শতভাগ বাস্তবায়ন করা গেলে এসডিজি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হবে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী ‘এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো বাস্তবায়ন : নীতি, অংশীদারত্ব ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এদিকে সম্মেলনের একটি অধিবেশনে বিএনপির ইশতেহার পর্যবেক্ষণের জন্য ‘রিফর্মট্রেকার ওয়েবসাইট’ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের (জিআইইউ) যৌথ উদ্যোগে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শেষ দিনের প্রথম অধিবেশনে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সংস্কার ও উন্নয়নে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো ও এসডিজি’ শীর্ষক আলোচনা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য মাধবী মারমা, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়া সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
সমাপনী অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. মনজুর হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এসএম আবদুল আওয়াল, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জাবিউল্লাহ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসডিজি ইতিমধ্যে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসডিজিতে যা আছে, তার থেকে বেশি ইশতেহারে আছে। তারেক রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন সময়ে যেসব কাজের কথা বলেছেন, তার অনেকগুলোই এসডিজির অংশ। তবে আমরা সেগুলোকে আলাদাভাবে এসডিজি হিসেবে চিহ্নিত করি না। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার যদি শতভাগ বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এসডিজিও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হবে। তিনি বলেন, এসডিজি কোনো দাতব্য কার্যক্রম নয়। দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন মান উন্নয়ন, নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক অধিকার নিশ্চিত হলে এর লক্ষ্য অর্জন হবে। প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা ক্রিয়েটিভ ইকোনমির মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাই। শুধু বাংলাদেশের বাজারের জন্য নয়, এসব পণ্যকে বিশ্ববাজারে বাজারজাতযোগ্য পণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু এসডিজি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা নয়। প্রতিবেদন হতে হবে যথার্থ এবং দেশের প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরতে হবে। অতীতে বাস্তবতা ও বিভিন্ন উপাত্ত-তথ্যের মধ্যে ব্যাপক ফারাক দেখা গেছে। বর্তমান সরকার কোনো ধরনের তথ্য বা উপাত্তের কারসাজি গ্রহণ করবে না। বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটি জেনে সেখান থেকে অগ্রগতি পরিমাপ করতে চায় সরকার।
তিনি বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে কর্মসূচিভিত্তিক গুচ্ছ প্রকল্পের ধারণায় যাওয়া হচ্ছে। একটি কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় পরিপূরক প্রকল্পগুলো সমন্বিতভাবে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রথমে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সফল হলে তা জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সংস্কার ও উন্নয়নে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো ও এসডিজি’ শীর্ষক অধিবেশনে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ হবে, যেখানে সবার আগে প্রাধান্য পাবে বাংলাদেশ এবং এই দেশ হবে সবার জন্য। এটি শুধু গুলশান-বনানীতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শুধু যারা দৌড়াতে পারে, তাদের জন্যও বাংলাদেশ নয়। যারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, ফুটপাতে বা রেলস্টেশনে ঘুমায়, তাদের জন্যও বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফার ধারাবাহিকতায় এসেছে ভিশন-২০৩০, যা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দিয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় এসেছে রাষ্ট্র সংস্কারের ২৭ দফা কর্মসূচি। পরে সব গণতন্ত্রকামী মানুষ ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সেটি রূপান্তরিত হয়েছে ৩১ দফার কর্মসূচিতে। এর লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, মানবিক ও বাসযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা। আমরা চাই, কেউ যেন দপ্তরে দপ্তরে না ছুটে। আমরা সবার কাছে যাব। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনতে চাই আমরা।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বিএনপির ইশতেহার পর্যবেক্ষণে ‘রিফর্মট্রেকার’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছে। শিগগিরই ওয়েবসাইটটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। এতে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারগুলো লিপিবদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতির কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তা-ও পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
সভাপতির বক্তব্যে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার কত হচ্ছে, শুধু তা দেখলে হবে না, কাঠামো ও গুণগত মান দেখতে হবে। বাংলাদেশ যখন এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছিল তখন দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমতে দেখা গেছে। কিন্তু বর্তমানে দারিদ্র্যবিমোচনের গতি কমে গেছে, পাশাপাশি বৈষম্য বেড়েছে। বাস্তবতা হলো, প্রতি তিনজন শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে একজন বেকার। সমাধানে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
সভায় দেশের কিছু জনগোষ্ঠীর এখনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা এখনো এনআইডি পাননি, তারা সরকারের বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দেশের পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য এনআইডি নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রথম পদক্ষেপ।
মাহদী আমিন বলেন, আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়িত হচ্ছে। সরকার সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চায়।
সেলিমা রহমান বলেন, আমরা এমন একটি অর্থনীতি চাই, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এমন শিল্পনীতি চাই, যার সুফল দেশের প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছাবে, নারীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়াবে। একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে।