শর্তেই ঘুরেফিরে জাইকা

মেট্রোরেল প্রকল্পের সম্পন্ন হওয়ার অংশের (এমআরটি-৬) কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। তাই এমআরটি প্রকল্পের বাকি অংশগুলোর খরচ কমানোর তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ ব্যয় বেড়েই চলেছে। ভারতের দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই ও কলকাতায় সাম্প্রতিককালে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ৪ থেকে ৬ কোটি ডলার (প্রায় ৪২৫ থেকে ৫১৫ কোটি টাকা) ব্যয় হয়েছে আর নির্মাণাধীন এমআরটি-১ লাইনে খরচ প্রতি কিলোমিটারে ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দরপত্রে প্রতিযোগিতা কম থাকায় খরচ বেড়ে প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান শিডিউল কিনলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যরা সরে দাঁড়াচ্ছে। দুয়েকটি ক্ষেত্রে চীনের প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা করছে। সে ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক কম রেটে কাজ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমআরটি-১-এর ৭ নম্বর প্যাকেজে চীনা প্রতিষ্ঠান যে দর দিয়েছে তাতে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ২২ থেকে ২৮ শতাংশ কম ব্যয় হবে। আর জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া দর অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হলে প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ৬০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বাড়তে পারে। কাজেই সরকারের ব্যয় কমানোর উদ্যোগটি ভালো। কূটনৈতিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতা মেনেই তা করতে হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেট্রোরেলের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শর্তের কারণে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেও জাপানের বাইরের কোনো ঠিকাদার পাওয়া যায় না। ঘুরেফিরে জাপানি দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠানই চূড়ান্ত দরপত্রে অংশ নেয়। তারা যে দর প্রস্তাব করে, তাই মেনে নিতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘এমআরটি-১-এর ৬ নম্বর প্যাকেজে প্রাকযোগ্য সাতটি ঠিকাদারই দরপত্র কেনেন। কিন্তু জমা দেয় দুটি জাপানি প্রতিষ্ঠান। ৪ নম্বর প্যাকেজে প্রাকযোগ্য ঠিকাদার ছিল ছয়টি। দরপত্র কেনে পাঁচটি। চূড়ান্ত দর প্রস্তাব করে মাত্র দুটি জাপানি প্রতিষ্ঠান।’

উল্লেখ্য, এমআরটি-১ কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর ও কুড়িল থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত মেট্রোলাইন ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করবে। এ লাইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশের আর্থিক টেন্ডার সম্প্রতি শেষ হয়েছে; টেন্ডারে চীনা ঠিকাদাররা প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে বেশ কম দর প্রস্তাব করেছে। প্রাকযোগ্যতা সম্পর্কিত নথি থেকে এ কথা জানা গেছে।

ভবিষ্যতের অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে আর্থিক শৃঙ্খলা বিধান ও ব্যয় সংকোচননীতি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাপানিরা ভালো কাজের কথা বলে, ১ শতাংশ বা তারও কম সুদে ঋণ দেওয়ার কথা বলে। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ২০ বছর। এসব শর্তকে যে কেউ ইতিবাচকভাবে নেবে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা যাচাই করে জাপানি প্রতিষ্ঠান। সে সময় তারা এমনভাবে রিপোর্ট তৈরি করে, যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছাড়া কেউ কাজ না পায়। সরঞ্জামাদিও জাপান থেকেই কিনতে হয়। চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কনসালট্যান্টও তাদের দেশের প্রতিষ্ঠানেরই থাকে। ফলে ব্যয় কমানোর প্রক্রিয়া গুরুত্ব পায় না।’

তিনি বলেন, ‘ভাড়া যেহেতু বাড়ানো যাবে না তাই মেট্রোরেল টেকসই করার জন্য খরচ কমানো, নির্মাণের সময় কমানো ও রেভিনিউ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। মেট্রোরেল জনপ্রিয় তবু ভর্তুকি দিয়ে চালাতে হচ্ছে। জাপানিরা আমাদের জন্য যে কাজটি করছে তা এমন যে, প্রিন্টার দিচ্ছে ফ্রিতে কিন্তু কালির দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাপানি ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আমরা দেউলিয়া হচ্ছি। সরকার ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। জাইকার আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে কাজ করা উচিত।’

মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনাকারী ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি (ডিএমটিসিএল) সূত্র জানায়, সরকার এমআরটি-১-এ ব্যয় ধরেছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। উত্তর রামপুরা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার পাতালরেল ও আটটি স্টেশন নির্মাণে তিনটি প্যাকেজের চূড়ান্ত দর পাওয়া গেছে। সবকটিতেই নেতৃত্বে আছে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তিন প্যাকেজে দর উঠেছে ৩০ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা; প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

কয়েকটি প্যাকেজে দর পাওয়ার পর পুরো প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ। দেখা গেছে, ব্যয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে লাইন-১-এর ৩১ কিলোমিটারের শুধু নির্মাণ ব্যয় দাঁড়াবে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর সঙ্গে যোগ হবে জমির দাম, পুনর্বাসন ব্যয়, বেতন-ভাতা, শুল্ক-কর, পরামর্শকের খরচ, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও অন্যান্য ব্যয়। মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৯৪ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা; প্রতি কিলোমিটারে খরচ ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। নির্মাণকাজে বিলম্বও ঘটাতে পারে।

এমআরটি-১-এর প্যাকেজ-৭-এর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে বাংলাদেশি-চীনা কোম্পানি যৌথ উদ্যোগ কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়। তাদের প্রস্তাবিত ব্যয় প্যাকেজ-৭-এর প্রাক্কলিত ব্যয় ২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা থেকে কম। এটা সরকারের বাজেটের ৭২ থেকে ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারের বাজেটের চেয়ে ২২ থেকে ২৮ শতাংশ কম।

প্রাকযোগ্যতা নথি ও আর্থিক প্রস্তাববিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে কম দরদাতা চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি)-ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড (এমআইএল)-মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (এমবিইসি) জেভি, যারা কাজ শেষ করার জন্য ১ হাজার ৫৭৫ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা প্রস্তাব করেছে। অন্যদিকে, চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন-চায়না রেলওয়ে রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ জেভি এবং সিনোহাইড্রো ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো এইট কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (এসইবিসিএল)-সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড (সিনোহাইড্রো) জেভি যথাক্রমে ১ হাজার ৭১০ দশমিক ৭৮ কোটি ও ১ হাজার ৬৮৭ দশমিক ৩৫ কোটি টাকায় কাজ শেষ করার প্রস্তাব দিয়েছে।

একই লাইনের অন্যান্য প্যাকেজে জাপানি কোম্পানিগুলো প্রাক্কলনের তুলনায় ৬০ থেকে ২০০ শতাংশ বেশি দর প্রস্তাব করেছে। এ কারণে সরকার কিছু ঠিকাদারের নিয়োগ স্থগিত করেছে বলে জানা গেছে। প্যাকেজ-৭-এর আওতায় ৫ দশমিক ০০৭ কিলোমিটার এলাকা ও তিনটি এলিভেটেড স্টেশনের নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রাথমিকভাবে এ প্যাকেজে জাপান, ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার নয়টি প্রতিষ্ঠান প্রাকযোগ্য ঠিকাদার হিসেবে অনুমোদন পায়। শেষ পর্যন্ত তিনটি চীনা সংস্থা আর্থিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। চারটি প্রাকযোগ্য জাপানি সংস্থা এ প্যাকেজের চূড়ান্ত টেন্ডার পর্যায়ে অংশ নেয়নি। অবকাঠামো বিশ্লেষকরা প্যাকেজ-৭-এর টেন্ডারের ব্যয়-কার্যকারিতার কারণ হিসেবে এর উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রকৃতিকে উল্লেখ করেছেন।

ডিএমটিসিএলের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্যাকেজ-০৭ প্রমাণ করে যে, জাপানি সংস্থা ছাড়া অন্য ঠিকাদাররাও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উচ্চমানের মেট্রোরেল নির্মাণ করতে পারে। যদি আরও প্যাকেজ বৈশ্বিক ঠিকাদারদের জন্য উন্মুক্ত থাকত, তাহলে ঢাকা মেট্রো আরও দ্রুত এবং কম খরচে করা যেত।’

সম্প্রতি জাইকা-অর্থায়িত মেট্রো প্রকল্পগুলোর উচ্চব্যয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ডিএমটিসিএলের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে এ প্রকল্পগুলোর ব্যয় অন্যান্য দেশের সমমানের প্রকল্পগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ডিএমটিসিএলের হিসাবে, ভারতে সাম্প্রতিককালে নেওয়া মেট্রোরেল প্রকল্পে খরচ ছিল প্রতি কিলোমিটারে ৫০০ কোটি টাকার কম। ভিয়েতনাম, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশে প্রস্তাবিত দরের চেয়ে কম টাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ করা হচ্ছে।

মেট্রোরেলের ব্যয় বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার বিভিন্ন শর্ত ও কম প্রতিযোগিতাকে দায়ী করছেন। প্রকল্পের দরপত্রে ঠিকাদার হিসেবে জাপানি কোম্পানিগুলোই অংশগ্রহণ করে। তারা যে দর হাঁকায়, তাতে দরকষাকষির সুযোগ কম থাকে।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ‘সরকার চলমান মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর বৃদ্ধি পাওয়া ব্যয় নিয়ে পুনরালোচনার চেষ্টা করবে।’ ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মেট্রোরেল চাই। তবে খরচ কমানোর বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। প্রকল্পে এমন একটি আর্থিক কাঠামো বেছে নিতে হবে, যা প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে সহায়ক। এতে ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিশ্বমানের ঠিকাদারদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।’

এমআরটি-১ নির্মাণ ও ট্রেন কেনাসহ সব কাজ ১৪টি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ডিপো উন্নয়নের কাজও চলছে। জাপানি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এ কাজ করছে।