গাজায় ইসরায়েল ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে : জাতিসংঘ

জাতিসংঘ প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ‘গণহত্যা’ চলছে বলে স্বীকার করল। জাতিসংঘের তদন্ত দল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগ এনেছেন। তারা বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই এই গণহত্যা চালানো হচ্ছে। এই কর্মকাণ্ডে উসকানি দেওয়ার জন্য তারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়ী করেছে জাতিসংঘের তদন্ত দল। এমন সময় জাতিসংঘের এই অভিযোগ তুলল, যখন ইসরায়েল সফর করছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইসরায়েলকে ‘অবিচল সমর্থন’ দিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান আরব দেশগুলোর নেতারা। পাশাপাশি ইসরায়েলকে মোকাবিলায় ‘ইসলামি সামরিক জোট’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী শিয়া আল-সুদানি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অনেক দিন ধরেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান চালানোর অভিযোগ তুলে আসছে। এমনকি ফিলিস্তিনবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ইতালীয় আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেসকা আলবানিজও তার প্রতিবেদনে গাজায় ‘গণহত্যা’র কথা বলেছেন। তবে জাতিসংঘ এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উপত্যকাটিতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ চলছে বলে স্বীকার করল। জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের (সিওআই) প্রধান নাভি পিল্লাই বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, গাজায় গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে এবং তা এখনো চলছে। তিনি আরও বলেন, এর দায় ইসরায়েল রাষ্ট্রের। সিওআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষ ও তাদের বাহিনী ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদে উল্লিখিত পাঁচটি গণহত্যামূলক কাজের মধ্যে চারটি করেছে। এগুলো হলো কোনো গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা; গোষ্ঠীর সদস্যদের গুরুতর  শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা; ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যা গোষ্ঠীটিকে আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় এবং গোষ্ঠীর মধ্যে জন্মহার রোধ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া।

তদন্তকারীরা বলেছেন, ইসরায়েলি বাহিনীর আচরণের ধরন থেকে এটা স্পষ্ট, ফিলিস্তিনিদের একটি গোষ্ঠী হিসেবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই এই গণহত্যা চালানো হয়েছে। প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট গণহত্যায় উসকানি দিয়েছেন এবং ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষ এই উসকানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বা তাদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ৮৩ বছর বয়সী পিল্লাই প্রতিবেদনে বলেন, এই নৃশংস অপরাধের দায় ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ স্তরের ওপর বর্তায়। দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক এই বিচারক একসময় রুয়ান্ডাবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের প্রধান এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, এই কমিশন কোনো আইনি সংস্থা না হলেও, এর প্রতিবেদন কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং আদালতের জন্য প্রমাণ সংগ্রহে সহায়ক হতে পারে। পিল্লাই বলেন, কমিশন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটরের সঙ্গে সহযোগিতা করছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে পিল্লাই বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গণহত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চুপ থাকতে পারে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, এটি থামাতে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়াটা এতে জড়িত থাকারই নামান্তর।

আরব দেশগুলোর অবস্থান

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন আরব ও মুসলিম দেশগুলোর নেতারা। কাতারের দোহায় আরব লীগ ও ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারে সামরিক জোট গঠনের প্রস্তাব এসেছে সম্মেলনে। গত ৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত নতুন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে দোহায় হামাস নেতাদের বৈঠক চলাকালে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার দোহায় জরুরি শীর্ষ সম্মেলনে বসে ৬০টি আরব ও মুসলিম দেশের প্রতিনিধিরা। সম্মেলনে আরব ও ইসলামি দেশগুলোর জন্য ন্যাটোর আদলে সামরিক জোট গঠনের প্রস্তাব দেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বলেন, যা ঘটছে তা শান্তি সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং এ অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এর পরিণতি হবে ভয়াবহ এবং আবারও আঞ্চলিক সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হবে। ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার এখনই সুযোগ বলে মন্তব্য করেন ওআইসির মহাসচিব। ইসরায়েলকে দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র আখ্যা দিয়ে, আন্তর্জাতিক নীরবতা ভাঙার আহ্বান জানান আরব লীগের মহাসচিব।

ইসরায়েলকে সমর্থনের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

ফিলিস্তিনের গাজায় নৃশংস হামলা ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যে ইসরায়েল সফর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সোমবার জেরুজালেমে নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এ সময় পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে পরিকল্পনা করছে, তার সমালোচনা করেন রুবিও। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, গাজায় চলমান সংঘাতে ইসরায়েলকে ‘অবিচল সমর্থন’ দিয়ে যাবে তার দেশ। উপত্যকাটি থেকে হামাসকে নির্মূল করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। রুবিও বলেন, ভালো একটি ভবিষ্যৎ গাজার বাসিন্দাদের প্রাপ্য। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত হামাসকে নির্মূল না করা হবে, ততক্ষণ তারা কোনো ভালো ভবিষ্যৎ পাবে না। নেতানিয়াহুর উদ্দেশে রুবিও বলেন, আপনি আমাদের অব্যাহত সমর্থন ও অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করতে পারেন। গাজা নগরী দখলে ইসরায়েলি পরিকল্পনা নিয়েও নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের প্রশংসা করে তাকে ইসরায়েলের ‘সর্বকালের সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ বলে আখ্যা দেন নেতানিয়াহু।

পুড়ছে গাজা

গাজা সিটিতে নতুন করে স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল। গতকাল মঙ্গলবার দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, গাজার প্রধান নগরকেন্দ্র গাজা সিটিতে হামাসের ঘাঁটি ধ্বংস করতে মূল অভিযান শুরু হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ এক্সে লিখেছেন, আইডিএফ সন্ত্রাসী অবকাঠামোতে কঠোর আঘাত করছে। জিম্মিদের মুক্তি ও হামাসকে পরাজিত করার জন্য সেনারা বীরত্বের সঙ্গে লড়ছে। ফিলিস্তিনিরা বলেছেন, গাজা সিটি লক্ষ্য করে লাগাতার বোমা ফেলছেন ইসরায়েলি সেনারা। ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনী একযোগে গাজা উপকূলে আঘাত হানছে। আদালতে দুর্নীতির মামলার শুনানির শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘আমরা গাজায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান শুরু করেছি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে গতকাল অন্তত ৮০ ফিলিস্তিনি হয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ শহর ছাড়লেও, এখনো ৬ লাখ ৫০ হাজারের মতো মানুষ সেখানে রয়ে গেছে। জাতিসংঘ বলছে, দক্ষিণে যেসব জায়গায় জনগণকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোতে জায়গা কম ও খাদ্যসংকটে ভুগছে।’