দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার বার্তা পাঠিয়েছে নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠন। তবে তাদের প্রস্তাবে রয়েছে একাধিক শর্ত।
মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাতে সিপিআই (মাওবাদী) দলের প্যাডে লেখা একটি চিঠি প্রকাশ্যে আসে, যেখানে সংগঠনের এক শীর্ষ নেতার ছবিও ব্যবহার করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, জেলবন্দি সদস্য ও অন্যান্য শাখার কমরেডদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ করে দিলে এবং নিজেদের দাবির বিষয়ে সরকার নির্দিষ্ট মতামত জানালে তারা শর্তসাপেক্ষে অস্ত্র সমর্পণ করে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
চিঠিটির সত্যতা এখনো যাচাই করা হয়নি। তবে ডয়চে ভেলে সূত্র মারফত এই চিঠি পেয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে যে তা সরকারের হাতেও পৌঁছেছে। ছত্তিশগড়ের উপমুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজয় শর্মা প্রথম সরকারিভাবে এই চিঠি হাতে পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘চিঠিটি আসল হলে এই প্রথম মাওবাদীরা তাদের কোনো বিবৃতিতে ছবি ব্যবহার করলো।’
বিজয় শর্মা জানান, গণতন্ত্রে শর্তসাপেক্ষে কোনো আলোচনা হয় না। তবুও, চিঠিটি যাচাই করা হচ্ছে এবং এর সত্যতা প্রমাণিত হলে সরকারের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে নিজেদের অবস্থান জানানো হবে।
তিনি আরও বলেন, মাওবাদীদের জন্য এখনো মূলস্রোতে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে এবং এ বিষয়ে সরকার তাদের অবস্থান আগেই পরিষ্কার করে দিয়েছে।
প্রকাশ্যে আসা চিঠিতে সই করেছেন মাওবাদী কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্র ‘অভয়’। চিঠিতে যার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি মাওবাদী শীর্ষ নেতা বেনুগোপাল বলে মনে করা হচ্ছে। বেনুগোপাল ছিলেন নিহত শীর্ষ মাওবাদী নেতা কিষেণজির ভাই।
চিঠিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের উদ্দেশে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। ছত্তিশগড়কে মাওবাদীদের অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে গণ্য করা হয়। গত মে মাসে বস্তারে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মাওবাদীদের সংঘর্ষে ২৮ জন নিহত হন, যার মধ্যে ছিলেন মাওবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক বাসবরাজুও।
মাওবাদীদের চিঠিতে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও ই-মেইল ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ভিডিও কলের মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তারা সরকারের কাছে এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য এক মাসের সময় চেয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাসবরাজু সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীনও আলোচনার রাস্তা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল, এমনকি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরও সরকারি অভিযান অব্যাহত ছিল। তবে, সেই পথ থেকে তারা সরে আসতে চান না এবং এবার অস্ত্র সমর্পণ করে আলোচনায় বসতে আগ্রহী।
যদিও ছত্তিশগড়ের উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় শর্মা বলেন, সরকারের সঙ্গে মাওবাদীদের কোনো যুদ্ধ চলছে না, তাই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ‘অপ্রাসঙ্গিক’। ছত্তিশগড় পুলিশের আইজি পি সুনদারাজও চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেছেন, এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকার নেবে।
ডয়চে ভেলে সূত্র জানায়, মাওবাদী নেতৃত্বের মধ্যে এই প্রস্তাব নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির সব সদস্য এই সিদ্ধান্তে একমত নন এবং তাদের সবার সঙ্গে আলোচনার সুযোগও মেলেনি। সম্ভবত এই কারণেই তারা সরকারের কাছে এক মাসের সময় চেয়েছেন, যাতে জেলবন্দি এবং অন্য রাজ্যে থাকা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করা যায়।
প্রকাশ্যে আসা চিঠিটিতে তারিখ দেওয়া আছে ১৫ আগস্ট। প্রায় দুই মাস পর এটি জনসমক্ষে এসেছে। সূত্র জানিয়েছে, এটি সম্ভবত জঙ্গলে বসে লেখা হয়েছে। মাওবাদীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাতার অভিযান চলার কারণে চিঠিটি বাইরে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে কথা বলে একটি হালনাগাদ চিঠি প্রকাশ করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে অভূতপূর্ব বলে মনে করছেন। কারণ, মাওবাদীদের পক্ষ থেকে অস্ত্র সমর্পণ করে আলোচনায় বসার প্রস্তাব এই প্রথম।
সূত্র: ডয়চে ভেলে