বিশ্বজুড়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির চাপের মুখে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার ব্যাপারে একমত হয়েছে। উভয় পক্ষই চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি সফল হলে দুই অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে ভারত সফরকালে ইউরোপীয় বাণিজ্য কমিশনার মারোস সেফকোভিক বলেন, বছরের শেষ নাগাদ আলোচনা চূড়ান্ত করতে আমরা আমাদের প্রচেষ্টা সর্বোচ্চ করছি।
ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলও এই বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘ভারত ও ইইউ একে অপরের পরিপূরক এবং উভয় পক্ষেই বিশাল সুযোগ বিদ্যমান।’
কৃষি ও খাদ্য বিষয়ক কমিশনার ক্রিস্টোফ হ্যানসেন জানান, উভয় পক্ষই একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা জনগণ, কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের জন্য লাভজনক হবে। এর মাধ্যমে কৃষি খাত যে এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে।
তবে, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইউ বিশেষজ্ঞ গুলশান সচদেভা এই বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তিনি বলেন, ‘যদিও দুই পক্ষের বিবৃতিতে ক্রমবর্ধমান আশাবাদ প্রতিফলিত হচ্ছে, তবে এই চুক্তি আসলে সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তা চূড়ান্ত নয়।’
ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা প্রথম শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে, কিন্তু ২০১৩ সালে তা স্থগিত হয়ে যায়। প্রায় এক দশক পর, ২০২২ সালে পুনরায় আলোচনা শুরু হয়। গত দুই বছরে মোট ১৩ দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আগামী ৬-১০ অক্টোবর ব্রাসেলসে ১৪তম দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি এবং শুল্ক আরোপের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তারই ফলস্বরূপ ভারত ও ইইউ একে অপরের সাথে নির্ভরযোগ্য জোট ও স্থিতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে। বিশেষ করে, ভারতের রপ্তানির প্রায় অর্ধেক (৮৭ বিলিয়ন ডলার) মার্কিন শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর মধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য ২৫ শতাংশ জরিমানা শুল্কও অন্তর্ভুক্ত।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অনিল বাধওয়া বলেন, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ভারত-মার্কিন বাণিজ্য অংশীদারিত্বে অবিশ্বাস ও অবিশ্বস্ততা তৈরি করেছে, যা দীর্ঘ সময়ের জন্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তিনি আরও জানান, ভারতের শ্রম-নিবিড় শিল্পগুলোর জন্য নতুন বাজারের প্রয়োজন, যা কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।
এই চুক্তি ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভারতকে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ দেবে, মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং ইউরোপের প্রধান এশীয় অংশীদার হিসেবে ভারতের মর্যাদা বৃদ্ধি করবে।
অন্যদিকে, ইইউ-এর জন্য এই চুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলকে বৈচিত্র্যময় করবে, কৃষি ও প্রযুক্তি বাণিজ্যকে সুরক্ষিত করবে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে শক্তিশালী করবে।
এই আলোচনা সহজ নয়, কারণ দুই পক্ষই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর। ইইউ চাইছে গাড়ি, ওয়াইন, স্পিরিট এবং দুগ্ধজাত পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো। অন্যদিকে, ভারত তাদের বস্ত্র, ঔষধ, ইস্পাত এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের জন্য ইউরোপীয় বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার চায়।
বাধওয়া বলেন, একটি প্রধান বাধা হলো ইইউ-এর কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম)। এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থা অনুযায়ী, ইস্পাত, সার এবং অ্যালুমিনিয়ামের মতো পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণের জন্য আমদানিকারকদের অতিরিক্ত কর দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিষয়গুলো সমাধান করা না গেলে বাণিজ্য চুক্তি সফল হবে না।
তবে, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোপীয় স্টাডিজ সেন্টারের চেয়ারপার্সন উম্মু সালমা বাভা মনে করেন, স্বয়ংচালিত খাতে একটি সাফল্য আসতে পারে। এর ফলে ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা ভারতীয় বাজারে এবং ভারতীয় কোম্পানিগুলো ইউরোপীয় বাজারে গাড়ির যন্ত্রাংশ রপ্তানিতে সুবিধা পাবে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনের ফেব্রুয়ারির ভারত সফর এবং জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াদেফুলের সাম্প্রতিক সফর এই আলোচনাকে আরও গতি দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি থেকে সৃষ্ট রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলার জন্য দুই পক্ষই দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী।
সচদেভা বলেন, ভারত ও ইইউ-এর অর্থনীতি একে অপরের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ইইউ বর্তমানে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার, যার মোট বাণিজ্যের পরিমাণ গত বছর ছিল ১২০ বিলিয়ন ইউরো।
দুই দেশের এই কৌশলগত ঐক্যই এই জটিল আলোচনাকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে
পথ হারাচ্ছে টেশিস
এমবাপ্পের জোড়া গোলে ১০ জনের রিয়ালের ঐতিহাসিক জয়
সারা দেশে বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস, বাড়বে তাপমাত্রা
চেলসি বায়ার্নের মিশন শুরু আজ