ঝুঁকি বীমার ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না শিল্প কারখানা

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। দীর্ঘ এই সময়ে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। একই সময় এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প কারখানা, গুদাম এবং অন্যান্য স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এতে শিল্পোদ্যোক্তারা বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তবে অপ্রত্যাশিত ক্ষতি মোকাবিলার জন্য প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান অগ্নি এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির বীমার প্রিমিয়াম পরিশোধ করলেও ঘটনার এক বছরেও বীমা দাবি পাচ্ছেন না কারখানা মালিকরা। এ নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। সমাধানে খাত সংশ্লিষ্ট অন্যতম বাণিজ্যিক সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) চিঠি দিয়েছে। বীমা দাবি বা ক্ষতিপূরণ পেতে তারা বীমা আইন ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নজির তুলে ধরেছেন।

আইডিআরএর পক্ষ থেকে বিটিএমএর চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করা হলেও বীমা দাবি বা নিষ্পত্তির বিষয়ে জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, সাধারণ বীমা করপোরেশনের পর্যালোচনা ও বীমা আইনের আলোকে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের উত্থাপিত বীমা দাবি নিষ্পত্তির সুযোগ নেই। তবে, উপমহাদেশের কয়েকটি দেশে ঘটে যাওয়া জেন-জি আন্দোলনের প্রভাব ও এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের বীমা দাবি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করে সংস্থাটি। যা ভবিষ্যতে বীমা পলিসির আওতায় আনার বিষয়ে আইডিআরএ উদ্যোগ নেবে।

অন্যদিকে আইডিআরএ এবং সাধারণ বীমা করপোরেশনের ব্যাখ্যার কারণে বীমা কোম্পানিগুলো নানা ধরনের পদ্ধতিগত জটিলতা এবং পলিসির শর্তের অপব্যাখ্যা করে দাবি পরিশোধে বিলম্ব করছে বলে জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

বিটিএমএর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকার পতন আন্দোলনের চূড়ান্ত ও পরবর্তী পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক অঞ্চলে কিছু দুষ্কৃতকারী ও উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক মিলে বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ চালায়, যাতে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো একটি বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়। অথচ ওই সমস্ত শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ আন্দোলকারী জনতার আক্রোশের শিকার বা আন্দোনের লক্ষ্যবস্তু ছিল না বা হতে পারে না। সংগঠনটি মনে করে, এটা একেবারেই স্পষ্ট যে, কিছু দুষ্কৃতকারী অস্থির রাজনৈতিক অবস্থার সুযোগে ওই সমস্ত শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহে লুটতরাজের হীন উদ্দেশ্যে নাশকতামূলক কর্মকা- চালায়।

জানা গেছে, চলতি বছর ৩ মার্চ রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমাকারী প্রতিষ্ঠান, সাধারণ বীমা করপোরেশনে দেশের সব বীমাকারী প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী বা প্রতিনিধি ও জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উত্থাপিত বীমা দাবি বিষয়ে একটি সভা করে। সভায় শিল্পকারখানার উত্থাপিত বীমা দাবির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে সভায় সাধারণ বীমা করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিদেশি পুনঃবীমাকারীদের বিষয়ে উল্লেখ করে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের উত্থাপিত বীমা দাবিকে পপুলার রাইজিং বা জনপ্রিয় উত্থান এবং সিভিল কমোশন বা নাগরিক বিশৃঙ্খলা এবং সন্ত্রাসজনিত ক্ষতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, উক্ত ক্ষতিকে অগ্নিবীমা এবং শিল্পকারখানার সব ঝুঁকি পলিসিকে আবরিত তথা আওতাভুক্ত নয় বলে অভিমত প্রদান করে।

সাধারণ বীমা করপোরেশনের এমন সিদ্ধান্তকে ত্রুটিপূর্ণ এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করছে বিটিএমএ। তারা সাধারণ বীমার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি বীমা আইন ২০১০ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন।

একইভাবে বীমা কোম্পানি আইনে ‘দাঙ্গা-হাঙ্গামা’ সংক্রান্ত ধারাকে বীমা দাবি প্রত্যাখ্যানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের থেকে বিরত রাখতে আইডিআরএকে এই ধারার একটি যৌক্তিক এবং স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রদানের দাবি জানিয়েছে বিটিএমএ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সেক্রেটারি জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিটিএমএ ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তুলে ধরেছে। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত আশানুরূপ কোনো প্রতিকার পাইনি। বিশেষ করে ৩ মার্চ সাধারণ বীমা করপোরেশন যেভাবে আমাদের মূল্যায়ন করেছে, সেটি তারা করতে পারে কি না, বা বীমা আইন ২০১০ এর আওতায় তারা এমন ব্যাখ্যা দিতে পারেন বলে আমরা মনে করি না। যাই হোক, আপাতত সমস্যার বিষয় ও সমাধানের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সদস্য কারখানা থেকে আমরা ক্ষতির পরিমাণ ও কারণ এবং ধরন জানতে চেয়েছি, সেটি পেলে ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের সময় ও পরবর্তী সময়ে ক্ষতির পরিমাণ বা পরিসংখ্যান বলা যাবে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহ দেখছি।

একই প্রসঙ্গে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সদস্য (সাধারণ বীমা) মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশের সাধারণ বীমা কোম্পানি যেসব বিষয়ে ইন্সুরেন্স কাভারেজ দিয়ে থাকে সেখানে জুলাই আন্দোলনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। পপুলার রাইজিং বা জনপ্রিয় উত্থান এবং সিভিল কমোশন বা নাগরিক বিশৃঙ্খলার বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ফলে এ নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

তবে উত্থাপিত বীমা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের অনেক দেশের উদাহরণ এসেছে, কিন্তু সেসব দেশে এমন ঘটনার পলিসি থাকতে পারে। সে জন্য তারা কাভারেজ দিচ্ছে। আমাদের দেশে এখনো এমন কোনো কাভারেজ আসেনি। কিন্তু আমাদের সাধারণ বীমা করপোরেশন বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ ও মতামত নিয়েছে। তারা এ বিষয়ে বাংলাদেশের বীমা দাবি এবং এর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে মতামত দিতে পারেনি। যাই হোক, আমাদের তো (জেন-জি) এটাই প্রথম, ভবিষ্যতে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। আবারও এমন ঘটনা ঘটতে পারে, সেটি মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিতে হবে। বীমা পলিসি ঠিক করতে হবে। রি-ইন্সুরেন্স (পুনঃবীমা) বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।