রেলে লাশ যন্ত্রণায় পুলিশ

রেললাইনের লাশ নিয়ে মহা যন্ত্রণায় পড়েছে পুলিশ; উদ্ধারের পর লাশের পরিচয় জানতে হিমশিম খাচ্ছে তারা। লাশের বিষয়ে কোনো ক্লু উদঘাটন করতে পারছে না তদন্তকারী সংস্থাগুলো। পুলিশ হতাশ বলা যায়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছে, দুর্বৃত্তরা অন্য কোথাও হত্যা করে লাশ রেললাইনের ওপর ফেলে রাখছে; তবে কারা জড়িত জানতে পারছে না। স্বজনরা কীভাবে মারা গেছে, ভুক্তভোগীরাও জানতে পারছে না।

সম্প্রতি পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাশ উদ্ধার নিয়ে পুলিশ যন্ত্রণার মধ্যে আছে। গত সাত বছরে দেশের রেললাইন থেকে ৯ হাজার ২৩৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বেশিরভাগ লাশের পরিচয় মেলেনি। মামলা ক্লুহীন থাকায় আদালতে অভিযোগপত্র দিতে পারছে না তদন্তকারী কর্মকর্তারা। রেললাইনের আশপাশে সিসি ক্যামেরা বসানোর পরামর্শ দিয়েছে পুলিশের বিশেষ একটি ইউনিট। পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার রেলপথের ৯৮ শতাংশ এলাকাই রাতে অন্ধকারে ঢাকা থাকে। অনেক এলাকা থাকে নির্জন। অপরাধীরা লাশ গুম করতে এসব এলাকা বেছে নিচ্ছে।

বলা হয়েছে, ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যুর ধরন আলাদা। প্রায়ই লাশ উদ্ধারের পর হত্যার সন্দেহ হলে পুলিশ আলাদা করে তদন্ত শুরু করে। কিন্তু রেললাইনের লাশের নমুনা ফরেনসিকে পাঠানো হলেও রহস্য আড়ালে থেকে যাচ্ছে। প্রতিবেদনটি সরকারের উচ্চমহলে পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খুনের পর লাশ ফেলা হচ্ছে রেললাইনে। এতে খন্ড-বিখন্ড- হচ্ছে মরদেহ। প্রাথমিকভাবে রেলে কাটা পড়ে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও পরে পুলিশি তদন্তে ও ফরেনসিক রিপোর্টে হত্যার পর মরদেহ রেললাইনে ফেলা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এ কাজের উদ্দেশ্য খুনের আলামত নষ্ট করা। ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ রেললাইনে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। চাঞ্চল্যকর এসব ঘটনায় অপরাধীদের নতুন কৌশল দেখে হতবাক খোদ পুলিশকর্তারা। এ নিয়ে পুলিশ কর্তারা কিছুদিন আগে বৈঠক করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরে। রেললাইনের লাশ উদ্ধার নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেখানে। রেলওয়ে ও জিআরপি পুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকেও (সিআইডি) লাশ উদ্ধারের ঘটনার নিখুঁত তদন্ত করতে বলা হয়েছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লাশ উদ্ধার হলেই পুলিশ জোরালো তদন্ত করছে। লাশের পরিচয় পেতে লম্বা সময় লেগে যাচ্ছে। বিশেষ করে ট্রেনে কাটা পড়া লাশগুলো নিয়ে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কিছুটা সমস্যা হয়। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি রহস্য উদঘাটন করে চার্জশিট দিতে। ইউনিটগুলোকে বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত মাসের শেষ সপ্তাহে রেললাইনের লাশ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে। তাতে লাশ উদ্ধার নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের গলদঘর্ম হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির আশ্রয় নিয়েও লাশের রহস্য উদঘাটন করা যাচ্ছে না। বেশিরভাগ লাশ অন্য স্থান থেকে এনে রেললাইনের ওপর ফেলা রাখা হচ্ছে। লাশ নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। কোনো কোনো মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে। তথ্য-প্রমাণ না থাকায় চার্জশিট দেওয়া যাচ্ছে না।’

পুলিশের যন্ত্রণা : দেশের বিভিন্ন স্থানে রেললাইনে কাটা পড়ে ও ট্রেনে চাপা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। রেলওয়ের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু এসব ঘটনার পর পুলিশের ওপর যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়, তা প্রায়ই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। লাশ উদ্ধার, সুরতহাল, ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো এবং পরিচয় শনাক্তকরণ পুরো প্রক্রিয়াটি পুলিশের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন জিআরপি থানায় হত্যা মামলা হয়েছে পাঁচটি। আর ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত গত সাড়ে ছয় বছরে হত্যা মামলা হয়েছে ৯২টি। রেলওয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, ৯৭টি খুনের মামলা হলেও বাস্তবে এর সংখ্যা আরও বেশি। তদন্তের দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকা ও লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় অনেক খুনের ঘটনা শেষ পর্যন্ত দুর্ঘটনা হিসেবে রয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রেললাইনে পুলিশি নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবার রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে ৯ হাজার ২৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে গত তিন বছরে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪০ জনে। প্রতিদিন গড়ে ট্রেনে কাটা পড়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট জিআরপি থানায়।

সুরতহাল ও তদন্ত : সাধারণত রেললাইনে লাশ পাওয়া গেলে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে লাশ এতটাই বিকৃত থাকে যে, সুরতহাল করা খুব কঠিন। এটা পুলিশের মানসিক যন্ত্রণার কারণ। এরপর শুরু হয় তদন্তের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। মৃত্যুর কারণ নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ হয়। ফরেনসিক রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত পুলিশকে অন্ধকারেই থাকতে হচ্ছে।

পরিচয় শনাক্তকরণে ভোগান্তি : রেললাইনে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাশের পকেটে পরিচয়পত্র বা মোবাইল ফোন থাকলে তা দিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসবও পাওয়া যায় না। তখন পুলিশকে স্থানীয় লোকজনের কাছে লাশের বর্ণনা দিয়ে পরিচয় জানার চেষ্টা করতে হয়। পরিচয় জানা না গেলে লাশটি বেওয়ারিশ গণ্য করা হয়। তখন ময়নাতদন্ত শেষে লাশটি দাফনের জন্য আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামকে দেওয়া হয়। কিন্তু মৃত ব্যক্তির পরিবার যদি পরে জানতে পারে এবং লাশ দাবি করে তখন পুলিশের ঝামেলা আরও বাড়ে। তখন ডিএনএ টেস্টের মতো জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

পরিবারে নানা যন্ত্রণা : এসব ঘটনায় শুধু পুলিশ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রিয়জনের আকস্মিক মৃত্যু এবং তার পরিচয় শনাক্তকরণের অনিশ্চয়তা তাদের জন্য এক অবর্ণনীয় মানসিক কষ্ট নিয়ে আসে। পুলিশকে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন পুলিশকর্তারা। তারা বলেন, রেললাইনে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।

বেশ কয়েক মাস কাজ করেছেন রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি (এইচআরএম অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স) শেখ মোহাম্মদ রেজাউল হায়দার। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটারের ওপর রেলপথ রয়েছে। পুরো রেলপথ পাহারা দেওয়া রেলওয়ে পুলিশের পক্ষে যৌক্তিকভাবে কখনো সম্ভব নয়। পুরো রেলপথই উন্মুক্ত, বেড়া কিংবা দেয়াল নেই। লাশের সুরতহাল দেখে সুস্পষ্টভাবে হোমিসাইড কেস প্রতীয়মান না হলে প্রাথমিকভাবে অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হচ্ছে। ফরেনসিক প্রতিবেদনের আলোকে পরে হত্যা মামলা রুজু করে পুলিশ এবং মামলার তদন্ত করছে।’ তিনি বলেন, ‘রেলওয়ে পুলিশ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলেও ঘটনাস্থল নির্ধারণে জটিলতা, ভিসেরা রিপোর্ট প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, সত্য উদঘাটনে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। অপরাধীরা কখনো কখনো এ সুযোগটাই নেয়।’

কিছু ঘটনার আদ্যোপান্ত : পুলিশ সূত্র জানায়, চলতি বছর ২৮ এপ্রিল পাবনার ঈশ্বরদী রেলওয়ে স্টেশনের দক্ষিণে উমিরপুরের কাছে খুলনা-পার্বতীপুর রেললাইনের ওপর বাদশা নামের এক ব্যবসায়ীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানা পুলিশ। ঘটনার আগের রাতে সাড়ে ৮টার দিকে অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে বাদশাকে তুলে নেয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে থানায় জিডি করে তার পরিবার। একপর্যায়ে জানা যায়, বাদশার দ্বিখণ্ডিত লাশ রেললাইনে পড়ে আছে। তার মুদি দোকান আছে। কে বা কারা তার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছিল। চাঁদা না পেয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে রেললাইনে রেখে যাওয়া হয়।

২৭ এপ্রিল মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে নিখোঁজের পরদিন উপজেলা পরিষদের কাছেই রেললাইনের পাশ থেকে ইকবাল হোসেন নামে এক যুবকের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ইকবালের স্ত্রী রিমা বলেন, ‘আমার স্বামী ট্রেনের নিচে পড়ে নিহত হতে পারে না। এটা পরিকল্পিত হত্যা। আমি স্বামী হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।’ পুলিশ মামলার তদন্ত করছে। একই বছরের ১৪ জানুয়ারি পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় রেললাইন থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি। ধর্ষণের পর হত্যা করে দুর্ঘটনা সাজাতে মৃতদেহ রেললাইনে ফেলে রাখা হয় বলে প্রাথমিক ধারণা পুলিশের। চলতি বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে হলদিবাড়ী রেললাইন থেকে হাত বাঁধা ও মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ভরত চন্দ্র রায় নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যার পর লাশটি রেললাইনে ফেলে রাখা হয়েছিল। গত বছর ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইন থেকে তৌহিদুল ইসলাম খোকন নামে এক পিকআপ ভ্যানচালকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন আছে। অন্য কোথাও খুন করে রেললাইনে তার লাশ ফেলে রাখা হয় বলে ধারণা পুলিশের।