জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি ২২ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যিক ফ্লাইটে নিউ ইয়র্ক পৌঁছাবেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সাধারণ বিতর্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশগ্রহণ করবেন।
গতকাল বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেগুনবাগিচা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রধান উপদেষ্টার সফরসূচি এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য হলো ‘ইউনাইটেড টুগেদার: ৮০ ইয়ার্স অ্যান্ড মোর ফর পিস, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’। এতে জাতিসংঘের তিনটি মূল স্তম্ভ শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার সমান গুরুত্ব পাবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন : এ বছর বাংলাদেশের জন্য এই অধিবেশন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। ৩০ সেপ্টেম্বর ‘হাই-লেভেল কনফারেন্স অন দ্য সিচুয়েশন অব রোহিঙ্গা মুসলিমস অ্যান্ড আদার মাইনরিটিজ ইন মিয়ানমার’ শীর্ষক এ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, গত বছর ড. ইউনূস জাতিসংঘে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলো সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেছিল। এর আগে গত আগস্টে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে বাংলাদেশ একটি সংলাপের আয়োজন করেছিল।
যুবসমাজ ও নারী-শান্তি-নিরাপত্তা : ২৫ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা বিশ্ব যুব কর্মসূচির ৩০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেবেন। তিনি বাংলাদেশের তরুণ সমাজের আশা-আকাক্সক্ষা তুলে ধরবেন, যারা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এবং বর্তমানে সংস্কার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এ ছাড়া, নারী, শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক ঐতিহাসিক রেজল্যুশনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
সাধারণ পরিষদে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য : ২৬ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেবেন ড. ইউনূস। তার ভাষণে উঠে আসবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সংস্কার কার্যক্রম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার, শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকা, রোহিঙ্গা সংকট সমাধান, জলবায়ু পরিবর্তন ও ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ, অভিবাসন, সম্পদ পাচার প্রতিরোধ, প্রযুক্তির টেকসই হস্তান্তর এবং ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তি উদ্যোগ।
বৈঠক ও কূটনৈতিক তৎপরতা : সফরকালে প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যর্থনায় অংশ নেবেন। এ ছাড়া, তিনি একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকার দেবেন।
অন্যদিকে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন, যার মধ্যে রয়েছে কমনওয়েলথ ফরেন অ্যাফেয়ার্স মিনিস্টার্স মিটিং (সিএফএমএম), পিসবিল্ডিং কমিশন, গ্রুপ অব ৭৭ ও চায়না, ওআইসি, বিমসটেক এবং এলডিসি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক।
সংস্কার ও গণতান্ত্রিক যাত্রার বার্তা : সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ, যার মাধ্যমে চলমান সংস্কার, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন আয়োজন এবং গণতান্ত্রিক যাত্রার বার্তা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরা হবে। বহুপক্ষীয় কূটনীতিকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থরক্ষার একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এ অধিবেশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হবে।’
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে চার রাজনীতিবিদ : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে চারজন রাজনীতিবিদ অংশ নেবেন। তারা হলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমরা একটি রূপান্তর পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছি এবং দেশ পরিচালনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের হাতে হস্তান্তর করা হবে, তাই তাদের প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বিদেশে রাষ্ট্রদূত বা কূটনৈতিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রধান লক্ষ্য হলো প্রতিনিধিদলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নেতিবাচক ঘটনাগুলো দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা। তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভ হবে, এটা আমরা ধরে নিচ্ছি। কারণ, এটি প্রতিরোধের কোনো উপায় আমাদের বা তাদের নেই।’ তিনি আরও জানান, পশ্চিমা দেশগুলোতে আইনি ও সরাসরি প্রতিবাদী কার্যক্রম সীমিত করা কঠিন। তাই নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করাই বাস্তবসম্মত সমাধান।