আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজন, উভয় কক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালু, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণসহ পাঁচ দফা দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশসহ সাতটি দল। দলগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাগপা। যদিও পিআর পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে।
গতকাল বিকেলে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটকে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরোয়ার বলেন, ‘তারা বলছে, এখন কী দরকার। নির্বাচনের পর করা যাবে। অথচ তাদের কারণেই এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড গড়ে ওঠেনি। আমরা বলেছি, নির্বাচনের আগেই সংবিধান, আদেশ ও গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে দেশ এক মহাদুর্যোগে পতিত হবে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের একমাত্র পথ পিআর পদ্ধতি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের রাজনীতিতে যে স্বচ্ছ নির্বাচনের আকাক্সক্ষা, সেই প্রচেষ্টা চালাচ্ছে জামায়াত। রাজপথে ও কমিশনে, দুই ক্ষেত্রেই কাজ করছে। কিন্তু একটি দল বারবার বাধা সৃষ্টি করছে জুলাই সনদের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে।’ তিনি বলেন,‘যারা এখনই বলে নির্বাচনের পর সব আইন ও সংস্কার মুছে দেবে, জনগণকে তাদের ভোটের মাধ্যমেই বিচার করতে হবে। এই সংস্কার যদি নির্বাচনের আগেই না হয় এবং বিদ্যমান কাঠামোয় নির্বাচন হয়, তাহলে আবার ফ্যাসিবাদের উত্থান হবেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আইনি ভিত্তি না থাকায় এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হচ্ছে না।’
জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘অনেকে বলেন, আপনারা আলোচনার টেবিল ছেড়ে রাজপথে যাচ্ছেন কেন? এর কারণ হচ্ছে, আলোচনায় কোনো ফল আসছে না। আমাদের আন্দোলন জনগণের আকাক্সক্ষা তুলে ধরার জন্য। জনগণ যদি গণভোটে পিআর না মানে, আমরা মেনে নেব। কিন্তু আপনারা গণভোটকে ভয় পাচ্ছেন কেন?’
জামায়াতে ইসলামির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামি বারবার বলেছে, অর্থবহ সংস্কার করতে হলে এর আইনি ভিত্তি প্রয়োজন। সেই ভিত্তির ওপরই আগামীর নির্বাচন হতে হবে। আর এই নির্বাচন সুন্দর করতে হলে পিআর পদ্ধতি দরকার। তাহলেই হবে ফ্রি, ফেয়ার, ক্রেডিবল এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। প্রশাসনও সুন্দরভাবে নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে ডাকসু, জাকসুর মতো।’
জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যারা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, জনগণ তাদের প্রতিরোধ করবে। সরকারের ভেতরে যারা ড. ইউনূসকে কুপরামর্শ দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হবে। নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সামান্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের ভোট গণনা করতে ৪০ ঘণ্টা লেগেছে। এভাবে ডাকসু-জাকসুর মতো যদি জয় হতে থাকে, তাহলে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হবে।’
জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে পালিত কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল।
গতকাল জোহরের নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে বিক্ষোভ মিছিল-পূর্ব এক সমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করিম বলেন, ‘যদি ঐকমত্য কমিশনে আপনারা সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, তাহলে সহজ কথা, আপনারা গণভোট দেন। রেফারেন্ডাম দেন। যদি জনগণ পিআর সিস্টেম নির্বাচনের পক্ষে থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই দাবি করতে পারি। আর যদি জনগণ পিআর সিস্টেম নির্বাচন না চায়, তাহলে আমরা দাবি করব না। যদি অন্য কারও ইঙ্গিতে আপনারা পিআর সিস্টেম নির্বাচন দিতে গড়িমসি করেন, তাহলে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে আপনাদের বাধ্য করবে পিআর সিস্টেমে নির্বাচন দেওয়ার জন্য।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতে হবে। এটা সবার দাবি, শুধু আমাদের দাবি নয়, জনগণেরও দাবি। কাজেই এটা দিতে অসুবিধা কোথায়? কাদের ইঙ্গিতে আপনারা দিচ্ছেন না? আমি মনে করি, ভারত চায় না জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতে। আপনারা কি ভারতের আশা এবং আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন? অন্তর্বর্তী সরকার কেন বসেছে, আমরা সবাই জানি সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। আপনি সংস্কার না করে কীভাবে নির্বাচন দেন? দৃশ্যমান বিচার না করে আপনি কীভাবে নির্বাচন দেন? যদি শুধু আপনি নির্বাচনের জন্য ক্ষমতায় বসেন, তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু যদি আপনি তিনটি বিষয়কে সামনে নিয়ে ক্ষমতায় বসেন, তাহলে অবশ্যই আপনাকে সংস্কার করতে হবে, দৃশ্যমান বিচার দেখাতে হবে, এরপর নির্বাচনে যেতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পিআর সিস্টেম নির্বাচনে বিএনপির আপত্তি থাকারই কথা না। কারণ তাদের একজন উঁচুপর্যায়ের নেতা বক্তব্য দিয়েছেন যে ৯০ শতাংশ ভোট তাদের। তাহলে তারা আসন পাবে ২৭০-এর ওপরে। তাতে এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে। সমস্যা কোথায়?’
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলনের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইমতিয়াজ আলম বলেন, ‘আমাদের দাবিগুলোর অন্যতম হলো, আওয়ামী ফ্যাসিস্টের সহযোগী ১৪ দলকে নিষিদ্ধ করতে হবে।’
এ সময় দলটির কেন্দ্রীয় সদস্য মুফতি আজহারুল করিম আবরার, যুগ্ম মহাসচিব আহমেদ আব্দুল কাইয়ুম প্রমুখ বক্তব্য দেন।
পরে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করিমের নেতৃত্বে এক-একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
এদিকে গতকাল বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারকে নিতে হবে। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে। জনগণ অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছিল ফ্যাসিবাদীদের বিচার, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য। কিন্তু আমরা দেখলাম সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয় পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র চলছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি দীর্ঘদিনের। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।’