আইন ও নীতি করে এ দেশে দুর্নীতি হয়েছে এমন মন্তব্য করে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, ‘বিগত সরকারের আমলে দুর্নীতি করার জন্যই বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। নানা কৌশলে আটঘাট বেঁধে যে দুর্নীতি হয়েছে, সেই কাঠামো আমরা ভেঙে দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘মুখে যাই বলি, আমরা আসলে সবাই দুর্নীতি চাই। রাজনীতিবিদের অনেকেই আমার কাছে বলেন, ১৬ বছর কিছু করিনি, একটু সুযোগ দিন। তাদের আমি কীভাবে সুযোগ দেব? আমরা তো প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সবার জন্য ব্যবসা উন্মুক্ত করে দিয়েছি।’
দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির জন্য আমলাতন্ত্রকে আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবেও চিহ্নিত করেন সরকারের সাবেক এই আমলা।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা, দুর্নীতি ও জ¦ালানি নিয়ে ওই আলোচনার আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।
অনুষ্ঠানে জ¦ালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘আগের সরকারের আমলে এই খাতে দায়মুক্তি আইন করে, অন্যায়ভাবে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ক্ষমতা খর্বসহ নানাভাবে দুর্নীতি করার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আমরা ভেঙে দিয়েছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর জ¦ালানি খাতে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের অনেক পুরনো বকেয়া ছিল। আমরা সব বকেয়া পরিশোধ করেছি। এগুলো জ¦ালানি নিরাপত্তারই অংশ।’
এ সময় তার হাতে থাকা তিনটি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অযাচিত ব্যয় কমিয়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করার কথা জানিয়ে ফাওজুল কবির বলেন, এসব অর্থ দিয়েই বিভিন্ন খাতের পুরনো বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হয়েছে।
সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা নিজেদের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট নয়। আসলে এত অল্প সময়ে অনেক কিছুই করা সম্ভব নয়। তবে বেশ কিছু আইনগত সংস্কার করা হয়েছে, যা দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি জনগণের কল্যাণ হচ্ছে।’
ফাওজুল কবির খান আরও বলেন, প্রতিবছর গ্যাসের উৎপাদন কমছে।
বিপরীতে চাহিদা বাড়ছে। সেজন্য এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। গত বছর ৮৪ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছিল। এ বছর ১০৮ কার্গো আমদানি করেছি। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে নানা পদক্ষেপ এবং বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির ব্যবহার বাড়ানোর জন্যও কাজ করছে সরকার।
সংস্কার প্রক্রিয়ারই সংস্কার দরকার : অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বিভিন্ন খাতে যে সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে সেই প্রক্রিয়ারই সংস্কার করা দরকার বলে অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের জুলাই ঘোষণা হয়েছে। জুলাই সনদের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করছে। এখানে সবাই সব বিষয়ে একমত হবে, এটা আমি কখনো চিন্তাও করি না। আমাদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বিষয়ে একমত হয়েছে। সব দল ও সব মানুষ সব বিষয়ে একমত হবে, এটা হতে পারে না। কিছু কিছু বিষয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। মতদ্বৈধতাও থাকতে পারে। তবে এ নিয়ে আমাদের কাউকে অধৈর্য হলে চলবে না।’
তার ভাষায় গণতান্ত্রিক পরিবেশে সব বিষয়ে রাজনৈতিক দল একমত হবে না, এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের কিছু ভিন্ন ভিন্ন নীতি ও কর্মসূচি থাকে। তবে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে বর্তমানে আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। অন্যথায় সংস্কার কাজে আসবে না। খোলা মন নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে।
মঈন খান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো সবাই সংস্কার নিয়ে একমত হয়ে যাবে, এটি ভাবা ভুল। সবাইকে একমতে এনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারণায় বিশ^াস করি না। প্রথাগত পদ্ধতি থেকে আমাদের বের হতে হবে। প্রথাগত ধারণা ও বদ্ধ চিন্তাভাবনা নিয়ে রাজনীতি করলে ৫ আগস্টের মতো পরিণতি আবার ঘটতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধগত নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ ছাড়া জ¦ালানি, খাদ্য, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় রাষ্ট্রের নিরাপত্তার আগে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত। ভোটাররা যাকে ভোট দেবেন, তারাই জিতবেন। এটি নিয়ে বিরোধের কিছু নেই।
বিএনপির কেন্দ্রীয় এই নেতা বলেন, ‘দেশের দরিদ্র মানুষের ভাত, কাপড় ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আগে জাতীয় নিরাপত্তার আলোচনার বিষয়টি মুখ্য নয়। এখন সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। পাশাপাশি গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অতীত নয়, বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের সামনের দিকে তাকাতে হবে। বর্তমান প্রজন্ম সেটাই চায়। আমাদের সবাইকে তারুণ্যের চাওয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থী ও জনতা বিরাট এক ধাক্কা দিয়ে স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছে। এখন আমাদের দেশ গঠনের দিকে তাকাতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পলাতক শেখ হাসিনার সরকার পলায়নের আগে পুলিশ ও প্রতিরক্ষা বাহিনীকে দিয়ে হাজারো ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। এটি তারা করেছে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য। রাষ্ট্র কিংবা জনগণের নিরাপত্তার জন্য তারা সেটি করেনি। কাজে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার চেয়ে আমাদের এসব বিষয়ে আলোচনা করা জরুরি।’
অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করলেও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো কমিশন হয়নি। নিরাপত্তা খাতে সংস্কারের সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। অথচ বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
এ সময় তিনি পানি, খাদ্য, পরিবেশ, জলবায়ু, নাগরিদের সুরক্ষাসহ বিভিন্ন নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা যেকোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত পূর্বশর্ত। সেজন্য জাতীয় ঐক্য খুবই দরকার। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোকে দেশের স্বার্থে একতাবদ্ধ হতে হবে।
সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম, সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি প্রমুখ।