শপথ নিলেন নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। আগামী ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ। নির্বাচনকে সামনে রেখে একে একে প্যানেল ঘোষণা করেছে ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো। নির্বাচনে প্যানেলে লড়বেন অধিকাংশ প্রার্থী। ক্যাম্পাসে সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচনী আমেজ। ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের নেতৃত্ব বাছাইয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে সুষ্ঠু পরিবেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।

চাকসু নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে যেকোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কথা ভাবছে কমিশন। এ ছাড়া ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এলইডি স্ক্রিনের ব্যবস্থা করা হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শপথ করানো হয়। চাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিনকে শপথবাক্য পড়ান চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াহ্ইয়া আখতার। পরে অন্য নির্বাচন কমিশনারদের শপথ বাক্য পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার। চাকসু নির্বাচনের সার্বিক কার্যক্রম শুরুর আগে চবি উপাচার্যের কার্যালয়ে শপথ বাক্য পড়ানো হয়।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে : চাকসু নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াহ্ইয়া আখতার। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. কামাল উদ্দিন ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ প্রশাসনের উচ্চপদের কর্মকর্তারা।

সভায় চবি উপাচার্য চাকসু নির্বাচনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ভোটগ্রহণ পদ্ধতি ও নির্বাচনের সুষ্ঠু আয়োজন সংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে ধরেন। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ঘটে যাওয়া হামলার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। চাকসু নির্বাচন আয়োজনে সরকার সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে বলে জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি জানান, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ফল দ্রুত ঘোষণার জন্য মেশিনের মাধ্যমে ভোট গণনা করা হবে। শিক্ষা উপদেষ্টা ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো এখন জাতীয় আগ্রহের বিষয় হিসেবে পরিণত হয়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে এমনটি সভার আলোচনায় উঠে আসে।

নারী শিক্ষার্থীদের ভোট চাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দেবে। নারী শিক্ষার্থীদের ভোট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনাবাসিক হওয়াতে তাদের ভোটও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে নির্বাচনে।

শামসুন নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাইমা মনি। তিনি মনে করেন যে প্যানেলে নির্বাচনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একজন প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা। তিনি কত গুরুত্বের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখেন সেটাই মুখ্য। জানতে চাইলে জান্নাতুন নাইমা মনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই চাকসু নির্বাচনকে কেউ যেন রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করুক। যে প্রার্থীই শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করবে তাকেই প্রাধান্য দেব। চাকসু নির্বাচনের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রার্থীরা যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। তারা প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরে গঠনমূলক ও শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করবেন এমনটাই চাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম রিমন একজন অনাবাসিক শিক্ষার্থী। তিনি চট্টগ্রাম নগরীর হিলভিউ আবাসিক এলাকায় থাকেন। সেখান থেকেই প্রতিদিন ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম রিমন বলেন, চবি ক্যাম্পাসে খুব কমসংখ্যক শিক্ষার্থী অবস্থান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগ শিক্ষার্থী শহরের বিভিন্ন বাসায় থাকেন। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রধান সমস্যা হল যাতায়াত ব্যবস্থা। আমরা আশা করি চাকসুতে যারা প্রার্থী হয়েছেন এবং যারা নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হবেন তারা অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সমস্যার বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন। আমি মনে করি ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভোট টানতে কাজ করবে। কারণ অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভোট চাকসু নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দেবে।

একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে বলে প্রত্যাশা করছেন চবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শিউলি আক্তার সূচি। চাকসু নির্বাচনে নিয়ে তার ভাবনার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাকসুর মতো একটা গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত। সুষ্ঠু পরিবেশে চাকসু নির্বাচন হবে বলে আমি মনে করি। যোগ্য প্রার্থীকে আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করতে চাই, যারা হবে আমাদের কণ্ঠস্বর। আমাদের যেকোনো ন্যায্য অধিকার আদায়ে চাকসু নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আমাদের পাশে দাঁড়াবে এমনটাই প্রত্যাশা।

চাকসু নির্বাচনে আঞ্চলিকতা প্রভাব ফেলতে পারে জানিয়ে শিউলি বলেন, চাকসু নির্বাচনে ছাত্রসংগঠনগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিকতা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও প্রার্থীর ভোটের সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

আগামী ১২ অক্টোবর চাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সপ্তম ক্যাবিনেট গঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আয়োজন করা হয় চাকসু নির্বাচন। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৬ বছর। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ছয়টি সংসদ গঠিত হয়েছে। ১৯৬৯-৭০ শিক্ষাবর্ষে চাকসুর প্রথম কেবিনেট গঠিত হয়। এই কেবিনেটে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন মো. ইব্রাহিম এবং জিএস ছিলেন মো. আব্দুর রব। ১৯৭০-৭১ শিক্ষাবর্ষে চাকসুর দ্বিতীয় কেবিনেটে ভিপি ছিলেন আ. ম. শামসুজ্জামান এবং জিএস ছিলেন মো. নাছির উদ্দিন। এই কেবিনেট ১৯৭১-৭২ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত কার্যকর ছিল। ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষে চাকসুর তৃতীয় কেবিনেট গঠিত হয়। এতে ভিপি ছিলেন এসএম ফজলুল হক এবং জিএস ছিলেন মো. গোলাম জিলানী চৌধুরী। ১৯৭৯-৮০ শিক্ষাবর্ষের চতুর্থ কেবিনেটে ভিপি ছিলেন মাজহারুল হক শাহ চৌধুরী এবং জিএস ছিলেন জমির উদ্দিন। ১৯৮০-৮১ শিক্ষাবর্ষের পঞ্চম কেবিনেটে ভিপি ছিলেন মো. জসীম উদ্দিন সরকার এবং মো. আব্দুল গফফার। ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষের পঞ্চম কেবিনেটে ভিপি ছিলেন মো. নাজিম উদ্দিন এবং জিএস ছিলেন আজীম উদ্দিন আহমেদ।