হ্যান্ডশেক বিতর্ক নিয়ে ঘটা তুলকালাম কাণ্ডের রেশ না কাটতেই ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় ক্রিকেট মাঠে ফের একবার উত্তপ্ত দ্বৈরথ। রবিবার দুবাইয়ে এশিয়া কাপের সুপার ফোর পর্বে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান। গ্রুপপর্বের দেখায় ভারতীয় দলের ৭ উইকেটের জয়ে শেষ হয়েছিল ম্যাচ, তবে ক্রিকেটীয় লড়াইয়ের চেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল ‘হ্যান্ডশেক বিতর্ক’। ম্যাচ শেষে ভারতীয় খেলোয়াড়রা পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানান। বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের ক্ষোভ বাড়তে থাকে এবং ক্রিকেটের চেয়ে রাজনীতির ছায়াই বড় হয়ে ওঠে।
১৪ সেপ্টেম্বরের ম্যাচকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে। খবর ছড়ায়, ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফট
পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আগাকে নির্দেশ দেন, টসের সময় ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের সঙ্গে হাত না মেলাতে। এরপর থেকেই বিষয়টি তীব্র আকার নেয়। পিসিবি পাইক্রফটকে সরানোর দাবি তোলে, এমনকি তাদের ম্যাচ বয়কটের হুমকিও দেয়। শেষ পর্যন্ত পাইক্রফটের সঙ্গে পিসিবি কর্তা, কোচ, অধিনায়কের বৈঠকের পর এক ঘণ্টা বিলম্বে আমিরাতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে নামে পাকিস্তান।
এশিয়া কাপে ভারত-পাকিস্তানের লড়াই সবসময়েই বাড়তি রঙিন হয় রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে। এবারের আসরেও ব্যতিক্রম নয়। চলতি বছরের মে মাসে সীমান্তে চারদিনের সংঘাতে ১৯৯৯ সালের পর দুই পারমাণবিক ক্ষমতাধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও গোলন্দাজ হামলায় নিহত হন অনেক মানুষ। এর আগের মাসে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে সাধারণ মানুষের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় নয়াদিল্লি পাকিস্তানকে দায়ী করেছিল। ইসলামাবাদ অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে। এমন প্রেক্ষাপটে এশিয়া কাপের ম্যাচগুলো কেবল ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়, হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দম্ভ ও কূটনৈতিক সংকেতের প্রতিফলন।
অবশ্য সুপার ফোরের এ ম্যাচ ঘিরে বিতর্ক প্রশমনের চেষ্টা করেছেন ভারতীয় স্পিনার কুলদিপ যাদব। তিনি বলেন, ‘যখন মাঠে নামি, আমার সামনে কেবল একজন ব্যাটার থাকে। পাকিস্তানের বিপক্ষেও আমি সবসময় এভাবেই ভেবেছি।’ অন্যদিকে পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আগা বলেন, ‘আমরা যদি সাম্প্রতিক মাসগুলোর মতো ভালো ক্রিকেট খেলি, তবে যেকোনো দলের বিপক্ষেই জেতার সামর্থ্য রাখি।’ ভারতীয় গণমাধ্যমের পর দেশটির অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব এরই মধ্যে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ‘হ্যান্ডশেক না করার’ নীতি বজায় থাকবে। ফলে মাঠের লড়াই যতটা উত্তেজনা তৈরি করবে, মাঠের বাইরে দ্বন্দ্বও ততটাই আলোচনার জন্ম দেবে। ওমানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের পর সূর্যকে পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জবাবে প্রতিবেশী দেশের নাম এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘সুপার ফোরের জন্য তৈরি।’ এতে স্পষ্ট হয়, পাকিস্তান ম্যাচকে আর পাঁচটা ম্যাচের মতোই দেখছে ভারত।
১৪০ কোটি ভারতীয়কে আরেকটি দারুণ রবিবার উপহার দেওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি। মাঠের বাইরের চাপ সামলানো নিয়ে ভারতীয় অধিনায়কের বক্তব্য, ‘ঘরের দরজা ও ফোন বন্ধ করে ঘুমাতে হবে। আমার মনে হয় এটাই সেরা উপায়। এটা বলা সহজ, কিন্তু সব সময় মেনে চলা কঠিন, কারণ অনেক সময় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে হয়, বাইরে ডিনারে যেতে হয়, আর অনেক খেলোয়াড় আছে যারা এসব বিষয় দেখতে পছন্দ করে, তাই এটা খুবই কঠিন। পুরো বিষয়টা আপনার ওপর নির্ভর করছে। আপনি কী শুনতে চান, কী মনের মধ্যে রাখতে চান। তারপর অনুশীলনে নামবেন অথবা ম্যাচ খেলতে যাবেন।’
৮ দেশ নিয়ে শুরু হওয়া এবারের এশিয়া কাপে গ্রুপ ‘এ’ থেকে ভারত ও পাকিস্তান এবং গ্রুপ ‘বি’ থেকে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা সুপার ফোরে উঠেছে। এই পর্বের খেলাগুলো শেষে ভারত ও পাকিস্তান ফাইনালে উঠলে ২৮ সেপ্টেম্বর দুবাইয়ে আবারও দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই দেখার সুযোগ পাবে দর্শকরা। গত আসরের ৫০ ওভারের এশিয়া কাপের শিরোপা জয়ী ভারত এবারও ট্রফি ধরে রাখার অন্যতম দাবিদার। তবে মহাদেশীয় গৌরবের লড়াই হলেও এবার যেন ক্রিকেটের চেয়ে রাজনীতিই প্রাধান্য পাচ্ছে বেশি। একদিকে খেলোয়াড়রা মাঠে সেরাটা দিতে চাচ্ছেন, অন্যদিকে দুই বোর্ডের টানাপড়েন ও রাজনৈতিক বার্তা ক্রিকেটের মূল সৌন্দর্যকে আড়াল করে দিচ্ছে। ফল যাই হোক, আজকের ভারত-পাকিস্তান লড়াইকে ঘিরে ক্রিকেট বিশ্ব আবারও দম আটকে অপেক্ষা করছেÑ মাঠে কি কেবল ব্যাট-বলের লড়াই হবে, নাকি আবারও রাজনীতি ছাপিয়ে যাবে ক্রিকেটকে?