ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল বের হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মিছিল থেকে বা মিছিলের ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রতিদিন প্রায় ১০-১৫ জনকে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। ঝটিকা মিছিলের বিরুদ্ধে তৎপর রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। যে এলাকায় দলটির কার্যক্রম দেখা যাবে সেখানের কর্মকর্তাদের বরখাস্তের নির্দেশও রয়েছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সক্রিয় রয়েছে অনলাইনেও। শিক্ষক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন মহলের বিশিষ্টজনরাও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে সক্রিয় দেখা গেছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এসব কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা ও টাকা আসছে বিদেশ থেকে।
আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনকালের পর অভ্যুত্থানের ফলে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। আবার অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেয়। প্রায় এক বছর ধরে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড না চললেও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি এসে আবারও সক্রিয় হতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। অবশ্য আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের। মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) প্রত্যাহারের কথাও বলা হয়।
নির্দেশনা অনুসারে, পুলিশের পেট্রোলিং, গোয়েন্দা নজরদারি ও চেকপোস্ট জোরদার করার কথা জানানো হয়।
গত কয়েক দিনে শাহবাগ, বাংলামোটর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ফার্মগেট, তেজগাঁও, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, মতিঝিল ও যাত্রাবাড়ী এলাকাসহ রাজধানীর অন্তত অর্ধশতাধিক স্থানে ঝটিকা মিছিল করেছে দলটির নেতাকর্মীরা। এমনকি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের এমন ঝটিকা মিছিলের কারণে চাপে পড়ছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কর্মকর্তারা। বিশেষ করে যেসব এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এমন ঝটিকা মিছিল করবে সেখানকার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) পেট্রোল ও পুলিশ পরিদর্শক পেট্রোল (পিআই)-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
সম্প্রতি ঝটিকা মিছিল নিয়ে ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী এক ওয়্যারলেস বার্তায় বলেন, ‘আপনারা কী করছেন আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমি আপনাদের অফিসে ডেকে বলেছি, যে এলাকায় মিছিল হবে ওই এলাকার অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকবে না। আগারগাঁওয়ে সকালে মিছিল হয়েছে, সন্ধ্যায়ও মিছিল হয়েছে। এখন পিআই ও এসি পেট্রোলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আমার এখন কোনো গতি নেই।’
এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ডিএমপি মাসিক অপরাধ পর্যালোচনায় ডিএমপির সব পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ যে কোনো সংগঠনের অপতৎপরতা রোধে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে বাঞ্চিত করা, নাশকতার পরিকল্পনা করা, ফের আওয়ামী লীগ দলকে চাঙ্গা করা ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে এই ঝটিকা মিছিল চালানো হচ্ছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো সম্প্রতি এই মিছিলগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
মিছিলের পাশাপাশি আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রয়েছে শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও বিশিষ্টজনদের উসকানিমূলক পোস্ট। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল একটি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘দিন যত যাচ্ছে আওয়ামী লীগের মিছিল তত বড় হচ্ছে।’
এর তিন দিন আগে তিনি আরেকটি পোস্টে লিখেছেন, ‘আজ রাজধানীর ১১টি জায়গায় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে একাধিকবার মিছিল হয়েছে। আওয়ামী লীগ এভাবেই ফিরে আসছে।’
আরেকটি পোস্টে লিখেছেন, “জুমার নামাজের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের মিছিল। আওয়ামী লীগ ফিরে আসছে। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’।”
গত শুক্রবার সকালে তিনি আরও এক পোস্টে লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ফিরে না আসার ইতিহাস নেই। আওয়ামী লীগ সবসময় ফিরে আসে বিজয়ের পতাকা নিয়ে।’
এসব পোস্টের নিচে সহস্রাধিক কমেন্ট পড়েছে, যেখানে লেখা ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’।
ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলগুলো নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তেজগাঁও ইন্দিরা রোড থেকে আশরাফুল আলম নামে এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে তেজগাঁও থানা পুলিশ। আশরাফুল আলম তেজগাঁও কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান হলেও তিনি গাজীপুর জেলার কাশিমপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এ বিষয়ে তেজগাঁও থানার ওসি মোবারক হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মিছিলগুলোতে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে আশরাফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে থানা-পুলিশ। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলাও হচ্ছে।’
শুধু ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বা আশরাফুল আলম নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী লীগের মতাদর্শীরা বিভিন্নভাবে ‘উসকানিমূলক’ পোস্ট দিচ্ছেন। যা দেখে অনেকেই সক্রিয় হয়ে উঠছেন ঝটিকা মিছিলে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো এলাকায় ‘ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ’-এর ব্যানারে কয়েকশ নেতাকর্মী ঝটিকা মিছিল বের করে। এর আগে বাংলামোটর, গুলশান, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও মতিঝিলসহ ঢাকার প্রায় সব এলাকায়ই আওয়ামী লীগের একাধিক ঝটিকা মিছিল হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ ৫০-১০০ জন বা এরও অধিক লোকজন নিয়ে মিছিল বের করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ‘শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা’, ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’; ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’; ‘হটাও ইউনূস, বাঁচাও দেশ’ ইত্যাদি সেøাগানে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা।
মিছিলে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, ঘরে বসে থাকলেও বাঁচার সুযোগ নেই, তাই মিছিলের নির্দেশ পেয়ে লোকজন নিয়ে নেমে পড়ছেন তারা।
তারা বলছেন, শেখ হাসিনাসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এর প্রতিবাদে মিছিল করছি।
ঝটিকা মিছিলের বিষয়ে ডিএমপির একাধিক থানার ওসির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হঠাৎ করেই ৩০-৪০টি ছোট ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নেমে যায় তারা। তখন ওই স্থানে পর্যাপ্ত পুলিশ না থাকায় কিছু করা সম্ভব হয় না। তবে প্রায় সব ঝটিকা মিছিল থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া মিছিলের ছবি, ফেসবুক লাইভ ও সিসিটিভি ফুটেজ দেখেও প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএমপি বা পুলিশ সদর দপ্তর ক্লিয়ার করে বলে দিয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল বা মিটিং দেখা মাত্রই ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই অনুসারে সব থানা-পুলিশ তৎপর রয়েছে। প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট এক সূত্র বলেছে, ঝটিকা মিছিলের ব্যাপারে বিভিন্ন থানার কর্মকর্তাদের গা ছাড়া ভাব থাকায় ডিএমপি কমিশনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় রাজধানীতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে একটি সংস্থার প্রতিনিধি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির ভেতরে অনৈক্য বাড়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দল সুযোগ নিচ্ছে; বিশেষ করে ডাকসু নির্বাচন ঘিরে এই বিভাজন প্রকট হয়েছে। ঝটিকা মিছিলে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ লোক বরগুনা, বরিশাল, গোপালগঞ্জসহ ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে আসছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
ওই বৈঠকে ঝটিকা মিছিলের বিষয়টি পুলিশকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি মিডিয়া বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল ঠেকাতে সব কর্মকর্তাকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিএমপির ৫০ থানাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে তৎপর রয়েছেন।