ফার্মেসি খুলে মনমতো ওষুধ দিচ্ছে রোহিঙ্গারা

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় নতুন-পুরাতনসহ সাতটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে। এসব ক্যাম্পের ভেতরে রয়েছে শতাধিক ছোট-বড় অবৈধ ফার্মেসি। ক্যাম্পের ব্লকে ব্লকে গড়ে ওঠা এসব ফার্মেসি চালাচ্ছে অদক্ষ রোহিঙ্গারা।

অভিযোগ উঠেছে, ফার্মেসিগুলো বেশিরভাগই অনভিজ্ঞ এবং যুবক শ্রেণির রোহিঙ্গারা চালাচ্ছে। তারা ইচ্ছামতো চিকিৎসার দিচ্ছে বলে ক্যাম্পে কর্মরত উন্নয়ন সংস্থার লোকজন এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। তারা জানান, এসব ফার্মেসিতে নেই কোনো ড্রাগ লাইসেন্স। তার ওপর নেই কোনো ফার্মাসিস্ট। তবু নিজের মতো করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সরেজিমনে গিয়ে দেখা যায়, চাকমারখুল ২১ নম্বর ক্যাম্প, উনচিপ্রায়ের রইক্ষ্যং ২২ নম্বর ক্যাম্প, আলীখালী ২৫ নম্বর ক্যাম্প, লেদা ২৪ নম্বর ক্যাম্প, নয়াপাড়া ২৬ নম্বর ক্যাম্প, জাদীমুরা ২৭ নম্বর ক্যাম্প ও মুচনী রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পসহ বিভিন্ন ব্লকে ব্লকে যত্রতত্র ওষুধের দোকান খুলে বসেছে রোহিঙ্গারা।

দেখা যায়, বেশিরভাগ দোকানেই ওষুধ বিক্রির কোনো ধরনের বৈধ লাইসেন্স নেই। যারা পরিচালনা করছে, তাদেরও চিকিৎসা বিষয়ে বিন্দুমাত্র প্রশিক্ষণ নেই। ক্যাম্প ম্যানেজমেন্ট কমিটির কয়েকজন লোক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, ক্যাম্পের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা কর্তৃক পরিচালিত ফার্মেসিগুলোয় সব ধরনের মেডিসিন পাওয়া যায়। তারা আরও জানিয়েছেন, এখানকার ফার্মেসিতে এমন কোনো মেডিসিন নেই, যা তারা ফার্মেসিগুলোয় তোলেনি। নতুন-পুরাতনসহ সাতটি ক্যাম্পে ছোট-বড় শতাধিক অবৈধ ওষুধের দোকান রয়েছে। ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন অনভিজ্ঞ লোকদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ফার্মেসিগুলো।

সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে শরণার্থীবিষয়ক কমিশনারের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং ওষুধ প্রশাসনের সঙ্গে এক যৌথসভা হয়েছে বলে জানা গেছে। সভায় ক্যাম্পের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের দ্বারা পরিচালিত অবৈধ ওষুধের দোকান বন্ধে ঔষধ প্রশাসনের নেতৃত্বে নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে কক্সবাজার সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়।

ঔষধ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ওষুধ আইন ১৯৪০ এবং তদধীন প্রণীত বিধি ‘দি বেঙ্গল ড্রাগ রুলস, ১৯৪৬’-এর শিডিউল সি এবং সি (১)-ভুক্ত এবং ওই শিডিউলবহির্ভূত জৈব ও অজৈব ওষুধ বিক্রি, বিক্রয় ও প্রদর্শনের নিমিত্তে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ১৪টি শর্তসাপেক্ষে ড্রাগ লাইসেন্স দেন। সে হিসেবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ওষুধের দোকানগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ এবং পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষিত হয়েছে। জনস্বার্থে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের দ্বারা পরিচালিত সব ফার্মেসি বন্ধ করার দাবি সচেতন মহলের।

লেদা ক্যাম্পের ডি-ব্লকের ৩৪৪ নম্বর কক্ষে জনৈক লোকমান হাকিমের ছেলে ডা. মো. হোছন কাগজপত্র ও কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই ফার্মেসি খুলে বসেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিনি ফার্মেসিতে বসে আসেন। একটু আগে রোগীর বাড়ি থেকে আসছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশের তরফ থেকে মাঝেমধ্যে বাধা এলেও পয়সাপাতি দিয়ে তাদের ম্যানেজ করে চলতে হয় আরকি।’

ড্রাগ লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ কক্সবাজারের ঔষধ প্রশাসনের ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক কাজী মোহাম্মদ ফরহাদের সঙ্গে কথা বলতে তার মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হয়। তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে ক্যাম্প-২৪-এর ইনচার্জ (সিআইসি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামীম আল ইমরান জানান, তাদের (রোহিঙ্গাদের) ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ফার্মেসির বিষয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে নিষেধ করা হয়েছে। এসব (ওষুধের দোকান) বন্ধে অতীতেও ছোটখাটো অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। শিগগির ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের দ্বারা পরিচালিত অবৈধ ওষুধের দোকান বন্ধে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহামুদুল হক জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে তাদের দ্বারা পরিচালিত ওষুধের দোকান বন্ধে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে শরণার্থীবিষয়ক কমিশনার এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যৌথসভা হয়েছে। সিদ্ধান্তের আলোকে প্রতি মাসে ঔষুধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে অভিযান পরিচালনা করবে, ক্যাম্প হোক বা ক্যাম্পের বাইরে হোক চিকিৎসার নামে কোনো ধরনের অপচিকিৎসা চলতে দেওয়া হবে না।