বর্তমানে বৈশ্বিক খেলনা শিল্পের বাজার ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু সে বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারেই তলানিতে। রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তার অভাব, কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কহার, বন্ডেড সুবিধার অনুপস্থিতি, অপ্রতুল অবকাঠামো, টেস্টিং সুবিধার অপর্যাপ্ততা প্রভৃতির কারণে এ শিল্পের রপ্তানি সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় উঠে এসেছে।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা চেম্বার আয়োজিত ‘রপ্তানি বহুমুখীকরণ, খেলনা উৎপাদন শিল্পে উদ্ভাবন এবং রপ্তানির সম্ভাবনা’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভায় এসব তথ্য উঠে আসে। মতিঝিলের ডিসিসিআই মিলনায়তনে মতবিনিময় সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডর (এনবিআর) সদস্য মুহাম্মদ মুবিনুল কবীর এবং বাংলাদেশের ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মার্টিন ডওসন বিশেষ অতিথি ছিলেন।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের বিষয়টি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিগত বছরগুলোয় আমাদের রপ্তানি গুটিকয়েক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। খেলনাসামগ্রী রপ্তানির বৈশ্বিক বাজার ১০২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০৩০ সালে ১৫০ বিলিয়নে পৌঁছাবে। এ খাতে আমাদের রপ্তানি মাত্র ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অনুপস্থিতি, টেস্টিং সুবিধার অপ্রতুলতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা, ব্যবহৃত কাঁচামালে আমদানিনির্ভরতা ও আমদানি পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্কারোপ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সহায়ক নীতিমালার অভাবে এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মত পোষণ করেন তাসকীন আহমেদ।
এনবিআরের সদস্য মুহাম্মদ মুবিনুল কবীর বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতের ওপর নজর দিতে হবে, এই লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-সংশ্লিষ্ট নীতিমালা সহজীকরণ ও বন্ডেড সুবিধা প্রদানে কাজ করে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে প্রণীত ট্যারিফ নীতিমালা অনুসারে রাজস্ব বিভাগ শুল্ক আরোপ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর কিছু সুপারিশ থাকে, যা মেনে চলতে হয়। তিনি বলেন, অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে কোনো নীতি সহায়তা পরিবর্তনের তেমন সুযোগ নেই। তবে আগামী বছরে বাজেট প্রণয়নের সময় এ খাতের প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদানের বিষয়টি সরকারের বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ৪০ বছর ধরে তৈরি পোশাক খাতে সহায়তা দেওয়া হলেও এ খাতের সক্ষমতা কতটুকু বেড়েছে, তা নিয়ে চিন্তার সময় এসেছে। তাই খেলনা শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রণোদনাপ্রাপ্তির চেয়ে নিজেদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো এবং পণ্যের উদ্ভাবনী কার্যক্রমে বেশি হারে মনোযোগী হওয়া জরুরি।
ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মার্টিন ডওসন বলেন, ‘বাংলাদেশে উৎপাদিত খেলনা পণ্য রপ্তানির প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রিটিশ সরকার এ খাতে সহযোগিতা করতে বেশ আগ্রহী। বিদ্যমান নীতিমালার সংস্কার ও প্রতিবন্ধকতা নিরসন করা সম্ভব হলে ব্রিটেনে এ খাতের পণ্যের রপ্তানি আরও বহুগুণ বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি জানান, ব্রিটিশ সরকার সম্প্রতি রুলস অব অরিজিনের শর্তাবলি সহজীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের তার দেশে পণ্য রপ্তানি সম্প্রসারণে সহযোগিতা করবে। তিনি উল্লেখ করেন, এনবিআর শিল্প খাতের কাঁচামালের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা নিরসন করেছে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং জালালাবাদ পলিমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, প্লাস্টিক খাতে বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ হাজারের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ২৫০টি খেলনাসামগ্রী উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত এবং এ খাতে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ কর্মরত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। তিনি জানান, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে খেলনাসামগ্রী রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৮টি দেশে রপ্তানির মাধ্যমে তা ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
তবে পণ্যের মান নিশ্চিতকরণ, অপ্রতুল অবকাঠামো, গবেষণা কার্যক্রমের অনুপস্থিতি এবং নতুন পণ্যের ডিজাইন উদ্ভাবনে পিছিয়ে থাকা প্রভৃতি বিষয়গুলোর কারণে এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে শামীম আহমেদ অভিমত প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে এ খাতের সার্বিক উন্নয়নে ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট, পণ্য উদ্ভাবনকাজে মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ প্রদান, জয়েন্ট ভেঞ্চার বিনিয়োগকে উৎসাহিতকরণ, অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন, প্লাস্টিক খাতের উন্নয়ন নীতিমালার মধ্যেই খেলনাসামগ্রী শিল্পের নীতিমালা প্রণয়ন, পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ওপর সম্পূরক শুল্কহ্রাস প্রভৃতির ওপর তিনি জোরারোপ করেন।
অনুষ্ঠানটির নির্ধারিত আলোচনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের পরিচালক ড. অশোক কুমার রয়, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের জয়েন্ট চিফ (ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ডিভিশন) মো. মামুন-উর রশিদ আসকারী, গোল্ডেন সন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলাল আহমেদ, কাপকেক এক্সপোর্টার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসির ওবায়েদ, প্রেমিয়াফ্লেক্স প্লাস্টিকস লিমিটেডের ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মো. আনিসুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (বর্জ্য এবং কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা) ড. আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।